মানুষ নিজের মনের গহীনের ভাব অপরের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যে আওয়াজ বা কথার জাল বুনে চলে, তা মূলত কিছু অর্থপূর্ণ ধ্বনি (Sound) বা ধ্বনি-সমষ্টিরই এক চমৎকার মেলবন্ধন। মানুষের সাথে মানুষের পারস্পরিক সামাজিক মেলবন্ধন আর সম্পর্কের সেতু টিকিয়ে রাখার প্রধান হাতিয়ারই হলো মুখ খুলে আওয়াজ করা বা কথা বলা; তবে শর্ত একটাই—সেই ধ্বনিগুলোকে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট অর্থবোধক হতে হবে, কারণ অর্থহীন চিৎকার মানুষ করতে পারলেও তা সমাজজীবন সচল রাখতে পারে না। মানুষের ভাষার এই প্রাণভোমরা ‘ধ্বনি’র সাথে জড়িয়ে আছে বিশ্বজুড়ে বহুল প্রচলিত দুটি তাত্ত্বিক শব্দ—Phonetics (ধ্বনিবিজ্ঞান) এবং Phonology (ধ্বনিপদ্ধতি); যার মধ্যে Phonetics মূলত ধ্বনির নিখুঁত পরিভাষা, মানুষের বাগযন্ত্র বা ধ্বনি উৎপন্নকারী অঙ্গের গঠন, ধ্বনির শ্রেণিবিন্যাস ও এর প্রকৃত রূপ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে, আর অন্যদিকে Phonology আলো ফেলে কোনো নির্দিষ্ট ভাষার নিজস্ব ধ্বনি-ব্যবস্থা, এর সুদীর্ঘ ইতিহাস এবং বিবর্তনের ধারার ওপর। আর তাই, ভাষা ও ব্যাকরণের এই অন্যতম ভিত্তি ‘ধ্বনি ও বর্ণ’ সম্পর্কে একদম ‘এ টু জেড’ (A to Z) জানার রোমাঞ্চকর যাত্রায় নামার আগে, চলুন খুব সহজে চিনে নেওয়া যাক আমাদের শরীরের সেই মূল জাদুকরী কারখানাটিকে—অর্থাৎ আমাদের ‘বাগযন্ত্র’, যার নিখুঁত জাদুতে আমরা প্রতিদিন অজস্র বৈচিত্র্যময় আওয়াজ আর কথার ফুলঝুরি ফুটিয়ে তুলি!
- বাগযন্ত্র
- ধ্বনি ও এর প্রকারভেদ
- স্বরধ্বনির প্রকারভেদ
- সংবৃত ও বিবৃত স্বরধ্বনি
- উচ্চারণ স্থান অনুযায়ী স্বরধ্বনি
- বর্ণ ও এর প্রকারভেদ
- মাত্রা কী এবং মাত্রা অনুযায়ী বর্ণের প্রকারভেদ
- ধ্বনি ও বর্ণের পার্থক্য
- বাংলা বর্ণমালা কাকে বলে
- বর্ণ ও অক্ষরের মধ্যে পার্থক্য
- স্পর্শধ্বনি ও এর প্রকারভেদ
- উষ্মধ্বনি
- অনুনাসিক বা নাসিক্য ধ্বনি
- অন্যান্য ধ্বনিসমূহ
- অঘোষ ও ঘোষ, অল্পপ্রাণ ও মহাপ্রাণ
- অঘোষ ও ঘোষ, অল্পপ্রাণ ও মহাপ্রাণ ধ্বনির বিচারে ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেণিবিভাগ
- সংযুক্ত বর্ণের তালিকা
☞ বাগযন্ত্র
আমরা গান গাওয়ার সময় ঢোল, তবলা, গিটার, একতারা কিংবা বাঁশির মতো যে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করি, সেগুলোর মূল কাজ হলো কাঠ, বাঁশ বা তারের মতো নানাবিধ উপকরণের সমন্বয়ে সুরযুক্ত আওয়াজ তৈরি করা। ঠিক একইভাবে, মানুষের ‘বাগযন্ত্র’ও সৃষ্টিকর্তার তৈরি বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় উপাদানের একটি অপূর্ব সমষ্টি। আমাদের স্বরতন্ত্রী, কণ্ঠ, জিহ্বা, তালু (মুখের ভেতরের ওপরের নরম অংশ), মূর্ধা (কঠিন তালু ও দাঁতের মধ্যবর্তী অংশ), ওষ্ঠ (ঠোঁট), দন্ত (দাঁত) ও নাসিকা (নাক)—সবকিছু মিলেই এই বাগযন্ত্র গঠিত, যার প্রধান কাজ হলো অর্থপূর্ণ আওয়াজ তৈরি করা। এই প্রক্রিয়ায় আমরা যখন নিঃশ্বাসের সাথে বাতাস গ্রহণ ও বর্জন করি, তখন সেই বাতাস গিয়ে ফুসফুস থেকে বের হওয়ার সময় স্বরতন্ত্রীতে আঘাত করে। স্বরতন্ত্রী মূলত ঢোলের পর্দার মতো একটি নরম পর্দা, যেখানে বাতাসের ধাক্কা লাগলেই কম্পন সৃষ্টি হয়। আর বিজ্ঞানের নিয়মানুযায়ী, যেকোনো শব্দ বা আওয়াজের উৎসই হলো এই কম্পন। পরবর্তীতে স্বরতন্ত্রীর সেই প্রাথমিক আওয়াজকে আমরা বাগযন্ত্রের অন্যান্য অংশের সাহায্যে রূপান্তর করে ইচ্ছামতো বিভিন্ন শব্দে পরিণত করি। তবে প্রশ্ন জাগতে পারে, মানুষের মুখ থেকে নিঃসৃত সব আওয়াজই কি ধ্বনি বা ভাষা? উত্তর হলো—না। সব ধ্বনিই একপ্রকার আওয়াজ, কিন্তু সব আওয়াজই ধ্বনি নয়; কেবল বাগযন্ত্রের সাহায্যে সৃষ্ট মানুষের মনের ভাব প্রকাশের উপযোগী অর্থপূর্ণ ও সুনির্দিষ্ট আওয়াজকেই ব্যাকরণের ভাষায় 'ধ্বনি' বলা হয়।
☞ ধ্বনি ও এর প্রকারভেদ
মানুষের বাগযন্ত্রের সাহায্যে হরেক রকমের আওয়াজ তৈরি করা সম্ভব হলেও সব আওয়াজের অর্থ প্রকাশের ক্ষমতা থাকে না। আমাদের চারপাশের দৈনন্দিন জীবনের অজস্র শব্দ বা আওয়াজের সবগুলো দিয়ে যেমন সুনির্দিষ্ট কিছু বোঝা যায় না, তেমনি মানুষের মুখনিঃসৃত সব আওয়াজকেও ব্যাকরণের ভাষায় 'ধ্বনি' বলা যায় না। মূলত বাগযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত অর্থপূর্ণ ও মানুষের মনের ভাব প্রকাশের উপযোগী আওয়াজই হলো ধ্বনি, যা ভাষার মূল ভিত্তি ও উপাদান। এককভাবে একটি ধ্বনির সাধারণত নিজস্ব কোনো অর্থ থাকে না; যেমন—মুখ দিয়ে শুধু ‘আ’ উচ্চারণ করলে কোনো অর্থ প্রকাশ পায় না। কিন্তু যখন একাধিক ধ্বনি বা ধ্বনিমূল (বাক-প্রত্যঙ্গজাত ধ্বনির সূক্ষ্মতম মৌলিক অংশ) একত্রে মিলিত হয়ে একটি সুনির্দিষ্ট অর্থ তৈরি করে, তখনই তা সার্থক শব্দে রূপ নেয়; যেমন—‘আ’ এবং ‘ম’ যুক্ত হয়ে যখন ‘আম’ গঠিত হয়, তখন আমরা একটি সুনির্দিষ্ট ফলকে বুঝতে পারি। সুতরাং, অর্থহীন যেকোনো আওয়াজ নয়, বরং মানুষের বাগযন্ত্র থেকে নিঃসৃত অর্থপূর্ণ ও সুসংহত ধ্বনিসমষ্টিই ভাষার মূল চালিকাশক্তি। ধ্বনি মূলত আমরা শুধু উচ্চারণই করতে পারে। ধ্বনি প্রকাশ করার আর কোন উপায় নাই। বাংলা ভাষার ধ্বনিগুলোকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:-
- স্বরধ্বনি: উচ্চারণের সময় মুখবিবরে বাতাস বাধা পায় না, স্বাধীনভাবে উচ্চারণ করা যায়।
- ব্যঞ্জনধ্বনি: উচ্চারণের সময় মুখবিবরের কোথাও না কোথাও বাতাস বাধা পায়, স্বাধীনভাবে উচ্চারণ করা যায় না। ব্যঞ্জনধ্বনির উচ্চারণে আবশ্যিকভাবে স্বরধ্বনির আগমন ঘটে।
উচ্চারণের কাল-পরিমাণ অনুযায়ী স্বরধ্বনিকে দুইভাগে ভাগ করা যায় যথাঃ হ্রস্বস্বর ৪টি ( অ,ই,উ,ঈ ) এবং দীর্ঘস্বর ৭ টি ( আ,ঈ,ঊ,এ,ঐ,ও,ঔ )
☞ স্বরধ্বনির প্রকারভেদ
⮚ বাংলা স্বরধ্বনি ১১ টি । স্বরধ্বনিকে আবার ২ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:
- মৌলিক স্বর: এ ধ্বনিকে ভেঙে উচ্চারণ করা যায় না বা বিশ্লেষণ করা যায় না। মৌলিক স্বরধ্বনি ৭ টি। যথা: অ, আ, ই, উ, এ্যা, এ এবং ও। এগুলোকে পূর্ণ স্বরধ্বনিও বলে। ড. মুহম্মদ আব্দুল হাই বাংলা মূল স্বরধ্বনির তালিকায় নতুন ‘এ্যা’ ধ্বনি প্রতিষ্ঠা করেন।
- যৌগিক স্বর: দুটি স্বরধ্বনি একাক্ষর হিসেবে উচ্চারিত হলে তাকে যৌগিক স্বর বা দ্বিস্বর বা সন্ধিস্বর বলে। বাংলায় যৌগিক স্বরধ্বনির সংখ্যা ২৫ টি। যেমন: অ + এ = অয়, আ + এ = আয় ইত্যাদি।
⮚ উচ্চারণের ভিত্তিতে স্বরধ্বনিকে আবার নিম্নোক্তভাবেও ভাগ করা যায়-
- পূর্ণস্বরধ্বনিঃ উচ্চারণের সময় পূর্ণভাবে উচ্চারিত স্বরধ্বনিগুলোই পূর্ণস্বরধ্বনি।
- অর্ধস্বরধ্বনিঃ স্বরধ্বনিগুলো উচ্চারণের সময় পুরোপুরি উচ্চারিত হয় না তাদের অর্ধস্বরধ্বনি বলে অথবা যে স্বরধ্বনি নিজে পূর্ণ অক্ষর গঠন করতে পারে না,কিন্তু অক্ষর গঠনে সহায়তা করে তাকে অর্ধ স্বরধ্বনি বলে।পূর্ণ স্বরধ্বনি উচ্চারণ করার সময়ে টেনে দীর্ঘ করা যায়, কিন্তু অর্ধস্বরধ্বনিকে কোনাভাবেই দীর্ঘ করা যায় না।
- দ্বিস্বরধ্বনিঃ পূর্ণ স্বরধ্বনি ও অর্ধস্বরধ্বনি একত্রে উচ্চারিত হলে দ্বিস্বরধ্বনি হয়। যেমন: অয়, আয় ইত্যাদি।
☞ সংবৃত ও বিবৃত স্বরধ্বনি
- সংবৃত: যে স্বরধ্বনি উচ্চারণকালে মুখবিবর সংকুচিত হয় তাকে সংবৃত স্বরধ্বনি বলে।বাংলায় সংবৃত স্বরধ্বনি ২ টি। যথাঃ ই,উ।
- বিবৃত: যে স্বরধ্বনি উচ্চারণকালে মুখবিবর বিবৃত বা প্রসারিত হয় তাকে বিবৃত স্বরধ্বনি বলে।বাংলায় বিবৃত স্বরধ্বনি ২ টি।যথাঃ অ,আ।
☞ উচ্চারণ স্থান অনুযায়ী স্বরধ্বনি
| উচ্চারণ স্থান অনুযায়ী নাম | স্বরবর্ণ | উচ্চারণ স্থান অনুযায়ী নাম | স্বরবর্ণ |
|---|---|---|---|
| কন্ঠ বা জিহবামূলীয় বর্ণ | অ,আ | ওষ্ঠ বর্ণ | উ,ঊ |
| তালব্য বর্ণ | ই,ঈ | কন্ঠতালব্য বর্ণ | এ,ঐ |
☞ বর্ণ ও এর প্রকারভেদ
ধ্বনি নির্দেশক চিহ্নকে বা ধ্বনির লিখিত রুপকে বলা হয় বর্ণ অথবা ধ্বনিকে যখন আমরা লিখে প্রকাশ করি তখন সেটা হয়ে যায় বর্ণ। বাংলা বর্ণমালায় মোট বর্ণ ৫০টি।যেমন অ,আ, ক,খ । বর্ণ দুই প্রকার। যথা:- ১.স্বরবর্ণ ২.ব্যঞ্জনবর্ণ
স্বরবর্ণ: স্বরধ্বনি নির্দেশ করার জন্য ব্যবহৃত বর্ণ বা স্বরধ্বনির দ্যোতক লিখিত সাংকেতিক চিহ্নকে বলা হয় স্বরবর্ণ। বাংলা বর্ণমালায় স্বরবর্ণ ১১ টি: হ্রস্ব স্বর ৪টি (অ, ই, উ, ঋ), দীর্ঘ স্বর ৭টি (হ্রস্ব স্বর বাদে বাকিগুলো)।স্বরবর্ণের সংক্ষিপ্ত রূপ হল ‘কার। কার আছে এমন স্বরবর্ণ ১০টি (শুধুমাত্র “অ” এর সংক্ষিপ্ত রূপ নেই)।
মৌলিক স্বরজ্ঞাপক বর্ণ ৭টি: অ, আ, ই, উ, এ, ও, অ্যা। যৌগিক স্বরজ্ঞাপক বর্ণ ২টি: ঐ = অ + ই, ঔ = অ + উ। অন্যান্য যৌগিক স্বরের কোন আলাদা বর্ণ নেই।
বাংলা বর্ণমালায় যৌগিক স্বরজ্ঞাপক বর্ণ ২টি: ঐ = অ + ই, ঔ = অ + উ। অন্যান্য যৌগিক স্বরের কোন আলাদা বর্ণ নেই। বাংলা বর্ণমালায় মৌলিক স্বরজ্ঞাপক বর্ণ ৭টি: অ, আ, ই, উ, এ, ও, অ্যা
ব্যঞ্জনবর্ণ: ব্যঞ্জনধ্বনি দ্যোতক লিখিত সাংকেতিক চিহ্নকে বলা হয় ব্যঞ্জনবর্ণ। বাংলা বর্ণমালায় ব্যঞ্জনবর্ণ ৩৯টি (প্রকৃত ৩৫টি + অপ্রকৃত ৪টি) । ব্যঞ্জনবর্ণের সংক্ষিপ্ত রূপ হল ‘ফলা’। ফলা আছে এমন ব্যঞ্জণবর্ণ ৬টি: ম, ন, ব, য, র, ল ।
☞ মাত্রা কী এবং মাত্রা অনুযায়ী বর্ণের প্রকারভেদ
বর্ণের উপরে যে রেখা বা দাগ দেওয়া থাকে তাই মাত্রা । মাত্রা অনুযায়ী বাংলা বর্ণ তিন ভাগে বিভক্ত। যথা:
- পূর্ণমাত্রাযুক্ত বর্ণ: বর্ণের উপর পূর্ণ মাত্রা থাকে। পূর্ণমাত্রাযুক্ত বর্ণ ৩২ টি।এর মধ্যে স্বরবর্ণ ৬টি ( অ,আ,ই,ঈ,উ,ঊ) এবং ব্যঞ্জণবর্ণ ২৬ টি।
- অর্ধমাত্রাযুক্ত বর্ণ: বর্ণের উপর অর্ধেক মাত্রা থাকে। অর্ধমাত্রাযুক্ত বর্ণ ৮ টি। টি।এর মধ্যে স্বরবর্ণ ১টি (ঋ) এবং ব্যঞ্জণবর্ণ ৭ টি (খ,গ,ণ,থ,ধ,প,শ)
- মাত্রাহীন বর্ণ: বর্ণের উপর কোন মাত্রা থাকে না। মাত্রাহীন বর্ণ ১০ টি। টি। এর মধ্যে স্বরবর্ণ ৪টি (এ.ঐ,ও,ঔ) এবং ব্যঞ্জণবর্ণ ৬টি (ঙ,ঞ,ৎ,ং,ঃ,ঁ)
☞ ধ্বনি ও বর্ণের পার্থক্য
- ধ্বনি শুধুমাত্র আমরা শুনতে পারি কিন্তু দেখতে পাই না । অন্যদিকে বর্ণ আমরা দেখতে পাই না।
- ধ্বনির সৃষ্টি হয় বাগযন্ত্র দ্বারা কিন্তু বর্ণ শুধুমাত্র একটা চিত্র।
- ধ্বনি ক্ষণস্থায়ী যা উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথেই শেষ।অপরদিকে বর্ণ দীর্ঘস্থায়ী যা লেখার সাথে সাথেই শেষ হয়ে যায় না।
☞ বাংলা বর্ণমালা কাকে বলে
কোন ভাষায় ব্যবহৃত লিখিত বর্ণসমষ্টিকে সে ভাষার বর্ণমালা বলা হয়। যে বর্ণমালায় বাংলা বর্ণ লিখিত হয় তাকে বলা হয় বঙ্গলিপি বা বাংলা বর্ণমালা। বাংলা বর্ণমালায় মোট বর্ণ ৫০টি। স্বরবর্ণ ১১ টি ও ব্যঞ্জণবর্ণ ৩৯ টি ।
☞ বর্ণ ও অক্ষরের মধ্যে পার্থক্য
ধ্বনিকে লিখে প্রকাশ করার জন্য যে চিত্র অংকন করা হয় তাই হল বর্ণ বা হরফ। । অপরদিকে অক্ষর হল এক বা স্বল্পতম প্রয়াসে বা নিঃশ্বাসে ( নিঃশ্বাসে বলা যুক্তিযুক্ত হবে না তবে শুধু বোঝার জন্য বললাম ) যে ধ্বনি বা ধ্বনিগুচ্ছ একবারে উচ্চারিত হয় তাকে অক্ষর বলে। একে শব্দাংশ ও বলা যায়। ইংরেজি ভাষায় অক্ষরকে Syllable বলে। যেমন ‘বন্ধুর’ এখানে বর্ণ আছে ৫টি কিন্তু অক্ষর আছে মাত্র দুটি যথা একটা হল বন্ আরেকটা ধুর । অক্ষর উচ্চারণের কাল পরিমাণকে মাত্রা বলে।
☞ স্পর্শধ্বনি ও এর প্রকারভেদ
ক থেকে ম পর্যন্ত মোট ২৫ টি ধ্বনিকে স্পর্শধ্বনি (plosive) বা সৃষ্টধ্বনি ও বলা হয়। উচ্চারণস্থান অনুযায়ী এদেরকে পাঁচটি বর্গে ভাগ করা হয়।
| বর্গ | বর্ণ | উচ্চারণ স্থান অনুযায়ী নাম | উচ্চারণের স্থান |
|---|---|---|---|
| ক-বর্গীয় | ক খ গ ঘ ঙ | কন্ঠ্য বা জিহবামূলীয় বর্ণ | জিহবার গোড়ালি ও তালুর নরম অংশের সহযোগে |
| চ-বর্গীয় | চ ছ জ ঝ ঞ শ য য় | তালব্য বর্ণ | দন্তমূলের শেষাংশ ও জিহবার সহযোগে |
| ট-বর্গীয় | ট ঠ ড ঢ ণ ষ ড় ঢ় | মূর্ধন্য বর্ণ | দন্তমূল ও জিহবার সম্মুখভাগ |
| ত-বর্গীয় | ত থ দ ধ ন | দন্ত্য বর্ণ | জিহবার ডগা আর দাঁতের উপর পাটির সংস্পর্শে |
| প-বর্গীয় | প ফ ব ভ ম | ওষ্ঠ্য বর্ণ | দুই ঠোঁটের সংস্পর্শে |
☞ উষ্মধ্বনি
এসব ধ্বনি উচ্চারণের সময় মুখবিবরের কোথাও বাঁধা না পেয়ে কেবল ঘর্ষণপ্রাপ্ত হয়। উষ্মধ্বনি বা শিশধ্বনি ৪টি: শ, ষ, স( অঘোষ অল্পপ্রাণ), হ ( ঘোষ মহাপ্রাণ )।
☞ অনুনাসিক বা নাসিক্য ধ্বনি
এ ধ্বনি উচ্চারণের সময় নাক বা মুখ বা উভয় দিয়ে বাতাস বের হয়। নাসিক্য ধ্বনি বা বর্ণ ৫টি: ঙ, ঞ, ণ, ন, ম। মূলত বর্গের পঞ্চম ধ্বনিগুলোই নাসিক্য ধ্বনি।
☞ অন্যান্য ধ্বনিসমূহ
অন্তঃস্থ ধ্বনি বা বর্ণ : এসব ধ্বনির উচ্চারণ স্থান স্পর্শ ও উষ্মধ্বনির মাঝামাঝি। অন্তঃস্থ ধ্বনি ৪টি: ব, য, র, ল। এর মধ্যে আবার য তালব্য ধ্বনি, র কম্পনজাত ধ্বনি ও ল – কে পার্শ্বিক ধ্বনি বলা হয়।
পরাশ্রায়ী ধ্বনি বা বর্ণ ৩ টি : ং,ঃ, ৺ ( এ তিনটি বর্ণ স্বাধীনভাবে স্বতন্ত্র বর্ণ হিসেবে ভাষায় ব্যবহৃত হয় না।)
তাড়নজাত ধ্বনি: উচ্চারণের সময় দ্যোতিত ধ্বনি জিহ্বার উল্টো পিঠের দ্বারা দন্তমূলে দ্রুত আঘাত বা তাড়না করে। তড়নজাত ধ্বনি ২টি: ড়, ঢ়।
অযোগবাহ ধ্বনি: এসব ধ্বনির স্বর ও ব্যঞ্জনের সাথে কোন যোগ নেই। অযোগবহ ধ্বনি ২টি: (ং, ঃ)।
খণ্ড ব্যঞ্জণধ্বনি: ১টি (ৎ)।
নিলীন ধ্বনি : ১টি (অ)।
☞ অঘোষ ও ঘোষ, অল্পপ্রাণ ও মহাপ্রাণ
অল্পপ্রাণ ও মহাপ্রাণ ধ্বনি : যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় নিঃশ্বাস জোরে সংযোজিত হয় বা ফুসফুস থেকে বের হওয়া বাতাসের জোর বেশি থাকে, তাকে মহাপ্রাণ ধ্বনি বলে। আর যে ধ্বনিগুলোতে বাতাসের জোর কম থাকে, নিঃশ্বাস জোরে সংযোজিত হয় না, তাদেরকে অল্পপ্রাণ ধ্বনি বলে। ক, গ, চ, জ- এগুলো অল্পপ্রাণ ধ্বনি। আর খ, ঘ, ছ, ঝ- এগুলো মহাপ্রাণ ধ্বনি। অর্থাৎ বর্গের ১ম এবং ৩য় বর্ণ হলো অল্পপ্রাণ এবং বর্গের ২য় এবং ৪র্থ বর্ণ হলো মহাপ্রাণ ।
ঘোষ ও অঘোষ ধ্বনি : যে সকল ধ্বনি উচ্চারণের সময় স্বরতন্ত্রী অনুরণিত হয়, অর্থাৎ গলার মাঝখানের উঁচু অংশে হাত দিলে কম্পন অনুভূত হয়, তাদেরকে ঘোষ ধ্বনি বলে। আর যে সব ধ্বনি উচ্চারণের সময় স্বরতন্ত্রী অনুরণিত হয় না, তাদেরকে অঘোষ ধ্বনি বলে। যেমন, ক, খ, চ, ছ- এগুলো অঘোষ ধ্বনি। আর গ, ঘ, জ, ঝ- এগুলো ঘোষ ধ্বনি। অর্থাৎ বর্গের ১ম এবং ২য় বর্ণ হলো অঘোষ ধ্বনি বা বর্ণ এবং বর্গের ৩য় এবং ৪র্থ বর্ণ হলো ঘোষ ধ্বনি বা বর্ণ।
☞ অঘোষ ও ঘোষ, অল্পপ্রাণ ও মহাপ্রাণ ধ্বনির বিচারে ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেণিবিভাগ
| অঘোষ ধ্বনি | ঘোষ ধ্বনি | |||
|---|---|---|---|---|
| অল্পপ্রাণ | মহাপ্রাণ | অল্পপ্রাণ | মহাপ্রাণ | নাসিক্য |
| ক | খ | গ | ঘ | ঙ |
| চ | ছ | জ | ঝ | ঞ |
| ট | ঠ | ড | ঢ | ণ |
| ত | থ | দ | ধ | ন |
| প | ফ | ব | ভ | ম |
| শ,ষ,স | হ | |||
☞ সংযুক্ত বর্ণের তালিকা
| সংযুক্ত বর্ণ | উদাহরণ |
|---|---|
| ক্ত = ক্+ত | শক্ত |
| ক্র=ক্+র | চক্রান্ত |
| ক্ষ=ক্+ষ | বক্ষ |
| ঙ্ক= ঙ্+ক | অঙ্ক |
| ঙ্গ = ঙ্+গ | অঙ্গ |
| জ্ঞ= জ্ + ঞ | জ্ঞান |
| ঞ্ছ= ঞ+ছ | বাঞ্ছিত |
| ঞ্জ = ঞ+জ | গঞ্জ |
| ঞ্চ= ঞ্+চ | সঞ্চয় |
| ট্ট=ট্+ট | অট্টালিকা |
| ত্ত= ত্+ত | উত্তম |
| ত্+থ | উত্থান |
| দ্ধ= দ্+ ধ | বদ্ধ |
| ব্ধ = ব্ + ধ | লব্ধ |
| হ্ম = হ্ +ম | ব্রহ্মা |
| ক্ষ্ম = ক+ষ+ম | লক্ষ্নী |
| হ্ন=হ্+ন | মধ্যাহ্ন |
| হ্ণ=হ্+ণ | পূর্বাহ্ণ |
| হৃ=হ্+ঋ | হৃদয় |
| হু=হ্+ উ | হুকুম |
| ষ্ম= ষ্+ম | গ্রীষ্ম |
| ণ্ড = ণ্+ড | কাণ্ড |
| রূ = র্ + ঊ | রূপ |
| ষ্ঞ = ষ+ণ | তৃষ্ঞা |