পাবলিক সার্ভিস কমিশন (বিসিএস), ব্যাংক, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ কিংবা যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার গণিত অংশে সফল হওয়ার জন্য বর্গ ও বর্গমূল (Square & Square Root) অধ্যায়টির ওপর দখল থাকা অত্যন্ত জরুরি। গণিতের মৌলিক এই ধারণাটি স্পষ্ট না থাকলে অনেক সহজ প্রশ্নের সমাধান করতে গিয়েও পরীক্ষার্থীদের অমূল্য সময় নষ্ট হয়ে যায়।
বর্গমূল নির্ণয়ের প্রচলিত নিয়মের পাশাপাশি কম সময়ে নিখুঁত সমাধান করার কিছু বিশেষ শর্টকাট কৌশল জানা থাকলে পরীক্ষায় অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা সম্ভব। বিশেষ করে স্বাভাবিক সংখ্যা, দশমিক ভগ্নাংশ ও পূর্ণবর্গ সংখ্যা তৈরির টেকনিকগুলো আয়ত্ত করতে পারলে গাণিতিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
আপনার গণিত ভীতি দূর করতে এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিকে আরও শাণিত করতে এই আর্টিকেলে বর্গ ও বর্গমূল নির্ণয়ের বেসিক নিয়ম থেকে শুরু করে অপশন দেখে দ্রুত উত্তর বের করার শর্টকাট পদ্ধতিগুলো সহজ ভাষায় উপস্থাপন করা হলো। নিচে দেওয়া নিয়মগুলো অনুধাবন করুন এবং বিগত বছরের প্রশ্নগুলো অনুশীলনের মাধ্যমে নিজের প্রস্তুতিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিন।
বর্গ ও বর্গমূল
বর্গ ও বর্গমূলঃ কোন সংখ্যাকে একই সংখ্যা দ্বারা গুণ করলে যে গুণফল পাওয়া যায়, তাকে ঐ সংখ্যার বর্গ বলে এবং সংখ্যাটিকে গুণফলের বর্গমূল বলা হয়। যেমন, ৪×৪ বা ১৬ কে ৪ এর বর্গ এবং ৪ কে ১৬ এর বর্গমূল বলা হয়। বর্গমূল প্রকাশের জন্য দুইটি প্রতীক চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। ১৬ এর বর্গমূল বোঝাতে লেখা হয় √১৬ বা । সব সংখ্যারই বর্গমূল আছে , কিন্তু সব সংখ্যারই বর্গমূল পূর্ণ সংখ্যায় নেই ।যেমন- ৩ এর বর্গমূল ১.৭৩২ কিন্তু ৪ এর বর্গমূল ২ ।
পূর্ণ বর্গসংখ্যাঃ যে সংখ্যার বর্গমূল কোন পূর্ণসংখ্যা বা ভগ্নাংশের সমান, তাকে পূর্ণবর্গ বলা হয়। যেমন- ৪,৯,১৬,
কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যঃ
কোন পূর্ণ বর্গসংখ্যার একক স্থানীয় অঙ্ক ০,১,৪,৫,৬ বা ৯ হবে।
কোন পূর্ণ বর্গসংখ্যার একক স্থানীয় অঙ্ক ২,৩,৭ বা ৮ হতে পারে না।
যে সংখ্যার শেষে বিজোড় সংখ্যক শূন্য থাকে, ঐ সংখ্যা পূর্ণবর্গ নয়।
কোন বিজোড় স্বাভাবিক সংখ্যার বর্গকে ৮ দ্বারা ভাগ করলে প্রতিক্ষেত্রে ভাগশেষ ১ হবে।
একটি শূন্য যুক্ত সংখ্যার উপর বর্গ দিলে তা দ্বিগুণ হয়ে যায় , তেমনি দুৃটি শূন্য যুক্ত সংখ্যার বর্গমূল বের করলে তা একটি হয়ে যায়। যেমন- ১০০ এর বর্গ ১০০০০ আবার ১০০০০ এর বর্গমূল ১০০ ।
করণীঃ যে সকল সংখ্যা পূর্ণবর্গ নয়, যাদের বর্গমূল সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায়না, ঐ ধরনের বর্গমূলকে করণী বা অমূলদ সংখ্যা বলা হয়। যেমন-√৩, √৫, √৫০ ইত্যাদি।
কোনো সংখ্যার একক স্থানীয় অঙ্ক থেকে শুরু করে বামদিকে এক অঙ্ক পরপর যতটি ফোঁটা দেওয়া যায়, এর বর্গমূলের সংখ্যাটি তত অঙ্কবিশিষ্ট ।
স্বাভাবিক সংখ্যার বর্গমূল বের করার নিয়ম
দু পদ্ধতিতে বর্গমূল নির্ণয় করা যায় ।যথাঃ ১। উৎপাদক পদ্ধতি ২। ভাগ পদ্ধতি।
উৎপাদক পদ্ধতিতে বর্গমূল নির্ণয়ের নিয়মঃ
প্রথমে প্রদত্ত সংখ্যাকে মৌলিক উৎপাদকে বিশ্লেষণ করতে হয়।
প্রতিজোড়া একই উৎপাদককে একসাথে পাশাপাশি লিখতে হয়।
প্রতিজোড়া একজাতীয় উৎপাদকের পরিবর্তে একটি উৎপাদক নিয়ে লিখতে হয়।
লিখিত উৎপাদকগুলোর ধারাবাহিক গুণফল হবে নির্ণেয় বর্গমূল।যেমন-৩১৩৬ এর বর্গমূল কত?
এখানে, ৩১৩৬ = ২×২×২×২×২×২×৭×৭
= (২×২)×(২×২)×(২×২)×(৭×৭)
সুতরাং ৩১৩৬ এর বর্গমূল = ২×২×২×৭ = ৫৬
ভাগ প্রক্রিয়ার সাহায্যে বর্গমূল নির্ণয়ের নিয়মঃ
একটি উদাহরণের সাহায্যে ভাগ প্রক্রিয়ার সাহায্যে সাহায্যে বর্গমূল নির্ণয়ের পদ্ধতি দেখানো হলঃ
৩১৬৮৪ সংখ্যাটি লিখি ।
ডানদিক থেকে দুইটি করে অঙ্ক নিয়ে জোড়া করি । প্রত্যেক জোড়ার উপর রেখাচিহ্ন দিই ।
ভাগের সময় যেমন খাড়া দাগ দেওয়া হয়, ডানপাশে তদ্রূপ একটি খাড়া দাগ দিই ।
দেখা যাচ্ছে ডানদিকে দুইটি জোড়া ৮৪ ও ১৬ নেওয়ার পর ৩ অবশিষ্ট থাকে। জোড়া অবশিষ্ট না থাকলে একটি সংখ্যার সাথেই কাজ করতে হবে। ৩ এর পূর্ববর্তী বর্গসংখ্যাটি ১, যার বর্গমূল √১ বা ১ ; খাড়া দাগের ডানপাশে ১ লিখি ।
এখন ৩ এর ঠিক নিচে ১ লিখি ।
এখন ৩ থেকে ১ বিয়োগ করি ।
বিয়োগফল ২ এর ডানে পরবর্তী জোড়া ১৬ বসাই। ২১৬ এর বামদিকে খাড়া দাগ (ভাগের চিহ্ন) দিই ।
ভাগফলের ঘরের সংখ্যা ১ এর দ্বিগুণ ২ নিচের খাড়া দাগের বামপাশে বসাই। ২ এবং খাড়া দাগের মধ্যে একটি অঙ্ক বসানোর মতো স্থান রাখি ।
এখন একটি এক অঙ্কের সংখ্যা খুঁজে বের করি যাকে ২ এর ডানপাশে বসিয়ে প্রাপ্ত সংখ্যাকে ঐ সংখ্যাটি দ্বারা গুণ করে ২১৬ এর সমান বা অনুর্ধ্ব ২১৬ পাওয়া যায়।
এক্ষেত্রে ৭ হবে। ৭ সংখ্যাটি ভাগফলেও ১ এর ডানপাশে বসাই।
ভাগফলের স্থানে পাওয়া গেল ১৭।
এখন ২১৬ এর ঠিক নিচে ১৮৯ লিখি ।
এখন ২১৬ থেকে ১৮৯ বিয়োগ করি ।
বিয়োগফল ২৭ এর ডানে পরবর্তী জোড়া ৮৪ বসাই। ২৭৮৪ এর বামদিকে খাড়া দাগ (ভাগের চিহ্ন) দিই ।
ভাগফলের ঘরের সংখ্যা ১৭ এর দ্বিগুণ ৩৪ নিচের খাড়া দাগের বামপাশে বসাই। ৩৪ এবং খাড়া দাগের মধ্যে একটি অঙ্ক বসানোর মতো স্থান রাখি ।
এখন আবার ও একটি এক অঙ্কের সংখ্যা খুঁজে বের করি যাকে ১৭ এর ডানপাশে বসিয়ে প্রাপ্ত সংখ্যাকে ঐ সংখ্যাটি দ্বারা গুণ করে ২৭৮৪ এর সমান বা অনুর্ধ্ব ২৭৮৪ পাওয়া যায়।
এক্ষেত্রে ৮ হবে। ৮ সংখ্যাটি ভাগফলেও ১৭ এর ডানপাশে বসাই।
ভাগফলের স্থানে পাওয়া গেল ১৭৮ । এটিই নির্ণেয় বর্গমূল।
লক্ষণীয় যে ভাগের সাহায্যে বর্গমূল নির্ণয় করার সময় সংখ্যার ডান দিক অঙ্কের জোড় না থাকলে একে জোড়া ছাড়াই গণ্য করতে হবে।
সুতরাং ৩১৬৮৪ এর বর্গমূল ১৭৮ ।
দশমিক ভগ্নাংশের বর্গমূল বের করার নিয়ম
দশমিক ভগ্নাংশের বর্গমূল
পূর্ণসংখ্যা বা অখণ্ড সংখ্যার বর্গমূল ভাগের সাহায্যে যেভাবে নির্ণয় করা হয়েছে, দশমিক ভগ্নাংশের বর্গমূলও সেই নিয়মেই নির্ণয় করা হয়। দশমিক ভগ্নাংশের দুইটি অংশ থাকে। দশমিক বিন্দুর বামদিকের অংশকে অখণ্ড বা পূর্ণ অংশ এবং দশমিক বিন্দুর ডানপাশের অংশকে দশমিক অংশ বলা হয়।
দশমিক ভগ্নাংশের বর্গমূল করার নিয়মঃ
অখণ্ড অংশে একক থেকে ক্রমান্বয়ে বামদিকে প্রতি দুই অঙ্কের উপর দাগ দিতে হয়।
দশমিক অংশে দশমিক বিন্দুর ডানপাশের অঙ্ক থেকে শুরু করে ডানদিকে ক্রমান্বয়ে জোড়ায় জোড়ায় দাগ দিতে হয়। এরূপে যদি দেখা যায় সর্বশেষে মাত্র একটি অঙ্ক বাকি আছে, তবে তারপরে একটি শূন্য বসিয়ে দুই অঙ্কের উপর দাগ দিতে হয়।
সাধারণ নিয়মে বর্গমূল নির্ণয়ের প্রক্রিয়ায় অখণ্ড অংশের কাজ শেষ করে দশমিক বিন্দুর পরের প্রথম দুইটি অঙ্ক নামানোর আগেই বর্গমূলে দশমিক বিন্দু দিতে হয়।
দশমিক বিন্দুর এক জোড়া শূন্যের জন্য বর্গমূলে দশমিক বিন্দুর পর একটি শূন্য দিতে হয়। নিচে উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি দেখানো হল ।
উদাহরণ-১: ২৬.৫২২৫ এর বর্গমূল নির্ণয় কর।
উদাহরণ-২: ০.০০২৯১৬ এর বর্গমূল নির্ণয় কর।
অপশন ধরে দ্রুত বর্গমূল বের করার শর্টকাট নিয়ম
কোন বর্গ সংখ্যার শেষে ৫ থাকলে তার বর্গমূলের সংখ্যাটির শেষেও ৫ থাকবে ।
কোন বর্গ সংখ্যার শেষে ৬ থাকলে তার বর্গমূলের সংখ্যাটির শেষে ৪ অথবা ৬ থাকবে ।
কোন বর্গ সংখ্যার শেষে ১ থাকলে তার বর্গমূলের সংখ্যাটির শেষেও ১ ই থাকবে ।
কোন বর্গ সংখ্যার শেষে ৪ থাকলে তার বর্গমূলের সংখ্যাটির শেষে ২ থাকবে ।
কোন বর্গ সংখ্যার শেষে ০ থাকলে তার বর্গমূলের সংখ্যাটির শেষেও ০ থাকবে ।
নিচে এরুপ কিছু উদাহরণ দেখুন:
উদাহরণ: ১. ৭৩৯৬ এর বর্গমূল কত? [ সাব-রেজিস্টার পরীক্ষা-২০০১]
- (ক) ৮২
- (খ) ৭৫
- (গ) ৮০
- (ঘ) ৮৬
উত্তরঃ (ঘ) ৮৬
ব্যাখ্যা: [ শেষে ৬ আছে তাই উত্তর ৮৬ ]
উদাহরণ: ২. একটি শ্রেণীতে যতজন ছাত্র আছে প্রত্যেকে তত টাকা করে প্রদান করলে মোট ৬৫৬১ টাকা হয়। ছাত্র সংখ্যা কত ? [কর্মসংস্থান ব্যাংক সহকারী অফিসার-২০০১]
- (ক) ৮০
- (খ) ৮৫
- (গ) ৮১
- (ঘ) ৯২
উত্তরঃ (গ) ৮১
ব্যাখ্যা: [ শেষে ১ আছে তাই উত্তর ৮১ ]
আবার ঘুরিয়ে আসলে ও উপরের নিয়মগুলোই প্রয়োগ করবেন।যেমন:
উদাহরণ: ৩. ১৪৪ এর বর্গ কত? [ সাব-রেজিস্টার পরীক্ষা-২০০১]
- (ক) ২০৭৫৪
- (খ) ২০৭৩৬
- (গ) ২৫৭৫০
- (ঘ) ২০৭২২
উত্তরঃ (খ) ২০৭৩৬
ব্যাখ্যা: [ বর্গের ক্ষেত্রে শেষে ৪ এর থাকলে এর বর্গ সংখ্যাতে শেষে ৬ হবে ]
কখনো একাধিক অপশনের মধ্যে সন্দেহ হলে যে অপশন গুলো বাদ দেয়া যাবে তা বাদ দিয়ে অন্য গুলো থেকে উত্তর বের করতে হবে।যেমন:
উদাহরণ: ৪. একটি ছাত্রাবাসে কিছু ছাত্র থাকে। যতজন ছাত্র তত টাকা করে চাঁদা দেয়াতে যদি মোট ৫৭৬ টাকা উঠে তাহলে ঐ ছাত্রাবাসে মোট কতজন ছাত্র থাকে? [ সাব-রেজিস্টার পরীক্ষা-২০০১]
- (ক) ২৪
- (খ) ৩৫
- (গ) ২৮
- (ঘ) ২৬
উত্তরঃ (ক) ২৪
ব্যাখ্যা: প্রথমেই প্রশ্নের ৫৭৬ দেখে বুঝে নিতে হবে বর্গমূলের সংখ্যাটির শেষ ৪ অথবা ৬ হবে।তাহলে (খ) এবং (গ) অপশনটি খুব সহজেই বাদ দেয়া যায়।এখন ক ও খ এর মধ্যে ২৪ কে ২৪ আবার ৩৫ কে ৩৫ দ্বারা গুণ করে বের করতে হবে কোনটি সঠিক উত্তর।এখানে সঠিক উত্তর (ক) ২৪ ।
পূর্ণ বর্গ সংখ্যা তৈরি করা
২১৯৫২ সংখ্যাটিকে কত দ্বারা গুণ করলে সংখ্যাটি পূর্ণবর্গ সংখ্যা হবে?
যে কোন পূর্ণ বর্গ সংখ্যার ভেতরে অবস্থিত উৎপাদক গুলো সব সময় জোড়ায় জোড়ায় থাকে।তাই কোন সংখ্যার উৎপাদক জোড় না থাকলে যে সংখ্যার জোড়া থাকবে না তাকে দিয়ে গুণ করতে হবে।আবার ভাগ করতে বলা হলে যার জোড়া নেই তাকে দিয়ে ভাগ করতে হবে।
সমাধান:
সুতরাং ২১৯৫২ = ২×২×২×২×২×২×৭×৭×৭
= (২×২)×(২×২)×(২×২)×(৭×৭)×৭
যেহেতু এখানে একটি ৭ জোড়াবিহীন অবস্থায় রয়েছে।তাই ৭ দ্বারা গুণ করলে সংখ্যাটি পূর্ণবর্গ হবে।