দ্বিরুক্ত শব্দ কাকে বলে ? দ্বিরুক্ত শব্দ কত প্রকার ও কি কি?


বাংলা শব্দদ্বৈত বা দ্বিরুক্ত শব্দ একটি বিশিষ্ট বাগবিধি। সংস্কৃত ব্যাকরণে দ্বিরুক্তি প্রক্রিয়া একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। দ্বিরুক্ত বাংলা ভাষার একটি বৈশিষ্ট্য। বাংলা শব্দ গঠনে দ্বিরুক্ত শব্দের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এর মাধ্যমে রচনায় ব্যঞ্জনা সৃষ্টি হয় এবং ভাষা সুগঠিত রূপ পায় । বাংলা ভাষায় এই দ্বিরুক্ত শব্দের বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়; এমনটি আর কোনো ভাষায় দেখা যায় না। বিশেষ্য, বিশেষণ, সর্বনাম, অব্যয়, ক্রিয়া ইত্যাদি শব্দের দ্বিরুক্তির ব্যবহার যথেষ্ট পরিমাণে লক্ষণীয়। বাংলা ভাষার শব্দ গঠন প্রক্রিয়ার সাথে দ্বিরুক্ত শব্দ অঙ্গাীঙ্গাভাবে জড়িত। কেননা আমরা যখন কোন শব্দ দুইবার উচ্চারণ করে মনের ভাব প্রকাশ করি তখন ভাব প্রকাশের প্রক্রিয়ার মধ্যে একটা নতুনত্ব আসে।আজকের পাঠে আমরা দ্বিরুক্তি প্রক্রিয়াটি এ টু জেড জানার চেষ্টা করব।প্রথমেই আমরা দ্বিরুক্ত শব্দ কাকে বলে তা জানার চেষ্টা করি। 

 

দ্বিরুক্ত শব্দ
দ্বিরুক্ত শব্দ

দ্বিরুক্ত শব্দ কাকে বলে?

দ্বিরুক্ত অর্থ দু'বার উক্ত বা বলা হয়েছে এমন। বাংলা ভাষায় কোনো কোনো শব্দ একবার ব্যবহার করলে যে অর্থ প্রকাশ করে সেগুলো দু'বার ব্যবহার করলে অন্য কোন সম্প্রসারিত বা সংকুচিত অর্থ প্রকাশ করে। এ ধরনের শব্দের পরপর দু'বার প্রয়োগেই দ্বিরুক্ত শব্দ গঠিত হয়। যেমন— আমার ঘুম ঘুম লাগছে। অর্থাৎ ঠিক ঘুম নয়, ঘুমের ভাব অর্থে এই প্রয়োগ করা হয়েছে।

দ্বিরুক্ত শব্দের গঠনগত দিক

গঠনগত দিক থেকে বাংলা ভাষার দ্বৈতশব্দ বা দ্বিরুক্ত শব্দকে তিনভাগে ভাগ করা যায় :

১. একই শব্দের পুনরাবৃত্তি/শব্দের দ্বিরুক্তি

২. পদের দ্বিরুক্তি

৩. অনুকার দ্বিরুক্তি/ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্তি

১. শব্দের দ্বিরুক্তি

একই শব্দ যখন অবিকৃতভাবে দু'বার উচ্চারিত হয় তখন তাকে শব্দের দ্বিরুক্তি বলে। শব্দের দ্বিরুক্তিতে কোন পদের পরিবর্তন হয় না, কেবল অর্থের পরিবর্তন হয়।যেমন—দিন দিন, রোজ রোজ, লাল লাল, কেউ কেউ, পাকা পাকা ।

শব্দের দ্বিরুক্তি নানা রকম হতে পারে

ক. একই শব্দ দু বার ব্যবহার করে এবং শব্দ দুটি অবিকৃত রেখে । যেমন-: গলায় গলায় ভাব। চলতে চলতে একদিন জীবন থেমে যাবে। তার টুকরো টুকরো স্মৃতি আজও আমাকে ব্যথাদান করে।

খ. একই শব্দের সাথে সমার্থক আর একটি শব্দ যোগ করে। যেমন : মান- সম্মান, হিসাব-নিকাশ, ভয়-ভীতি ৷

গ. দ্বিরুক্ত শব্দ-জোড়ার দ্বিতীয় শব্দটির আংশিক পরিবর্তন করে। যেমন- ডাকাডাকি, হাঁকাহাঁকি, ভাগাভাগি ইত্যাদি ।

ঘ. সমার্থক বা বিপরীতার্থক শব্দযোগে। যেমন : রাস্তা-ঘাট, রীতি- নীতি, লাজ-লজ্জা ইত্যাদি।

দ্বিরুক্তি শব্দ বাক্যে প্রয়োগ

১. গলায় গলায় : রহিম ও করিমের গলায় গলায় ভাব।

২. বন্ধু-বান্ধব : বন্ধু-বান্ধব সব ছেড়ে নির্বাসনে যাচ্ছি।

৩. রোগ-শোক : রোগ-শোকের সাথে নিত্য বসতি জেলেপাড়ার লোকদের।

৪. ভয়-ডর : দস্যি ছেলেটার নাহি আছে ভয়-ডর।

৫. হিসাব-নিকাশ : জীবনের খাতায় হিসাব-নিকাশ করে ফলাফল হলো শূন্য।

৬. কুলি-মজুর : কুলি-মজুরের গান গেয়ে যাই ভালোবাসি কুলি-মজুরকে।

৭. লাজ-লজ্জা : লাজ-লজ্জা রেখে এলাম, বলতে এলাম ভালোবাসি।

৮. দিনে দিনে : দিনে দিনে সময় গিয়েছে চলে আসনি তুমি কাছে।

৯. দোষ-গুণ : দোষে-গুণেই মানুষ হয় পূর্ণ মানুষ ।

১০. শীত-বসন্ত : শীত-বসন্ত চলে গিয়ে আজ এসেছে বর্ষা রাতি প্রেয়সী আমার সেই যে গিয়াছে এখনো আসেনি ফিরি।

২. পদের দ্বিরুক্তি

একই বিভক্তিযুক্ত পদের দ্বিরুক্তিকে পদের দ্বিরুক্তি বলে। পদের দ্বিরুক্তিতে দ্বিতীয় পদের ধ্বনিগত পরিবর্তন হলেও বিভক্তির কোন পরিবর্তন হয় না। যেমন— ভালোয় ভালোয়, হেসে হেসে, কে কে, কার কার।

পদের দ্বিরুক্তির প্রয়োগ

ক. বিশেষ্য শব্দ যুগলের বিশেষণরূপে ব্যবহার:

১. আধিক্য বোঝাতে : রাশি রাশি ভারা ভারা, রাশি রাশি ধন, ধামা ধামা ধান।

২. সামান্য বোঝাতে : আমার কেমন জ্বর জ্বর লাগছে। দেখেছ তার কেমন কবি কবি ভাব।

৩. পরস্পরতা বা ধারাবাহিকতা বোঝাতে : তুমি দিন দিন রোগা হয়ে যাচ্ছ। থোকা থোকা ফুল ফুটছে।

৪. ক্রিয়া-বিশেষণ : ধীরে ধীরে যায়, ফিরে ফিরে চায় ৷

৫. অনুরূপ কিছু বোঝাতে : তার সঙ্গী-সাথী কেউ নেই।

খ. বিশেষণ শব্দযুগলের বিশেষণরূপে ব্যবহার:

১. আধিক্য বোঝাতে : কচি কচি ডাব নিয়ে আস। সুন্দর সুন্দর ফুল তুলে আন ।

২. তীব্রতা বা সঠিকতা বোঝাতে : গরম গরম জিলাপী। নরম নরম হাত।

৩. সামান্যতা বোঝাতে : উডু উডু ভাব। কালো কালো চেহারা। পচা পচা গন্ধ ।

গ. সর্বনাম শব্দ :

বহুবচন বা আধিক্য বোঝাতে : সে সে লোক গেল কোথায়? কে কে গেল? কেউ কেউ বলে সে নাকি রূপসী।

ঘ. ক্রিয়াবাচক শব্দ:

১. বিশেষণরূপে : এ দিকে রোগী বুঝি যায় যায়। এত খাই খাই করা ভালো নয়। তোমার নেই নেই ভাব আর গেল না ৷

২. স্বল্পকাল স্থায়ী বোঝাতে : দেখতে দেখতে আকাশ কালো হয়ে এল।

৩. ক্রিয়া-বিশেষণ : দেখে দেখে যেও। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে শুনলে কীভাবে?

৪. পৌনঃপুনিকতা বোঝাতে : ডেকে ডেকে হয়রান হয়ে গেছি।

ঙ. অব্যয়ের দ্বিরুক্তি

১. ভাবের গভীরতা বোঝাতে : ছি ছি তুমি কী করেছ? আর হায় হায় করে লাভ কি! যা হবার তা হয়েছে।

২. পৌনঃপুনিকতা বোঝাতে : বারবার কামান গর্জে উঠল।

৩. অনুভূতি বা ভাব বোঝাতে : ভয়ে গা ছম ছম করছে। ফোঁড়াটা পেকে টনটন করছে।

৪. ধ্বনিব্যঞ্জনা বোঝাতে : ঝির ঝির করে বাতাস বইছে। বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর ।

৫. বিশেষণ বোঝাতে : পিলসুজে বাতি জ্বলে মিটির মিটির।

৩. ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্তি কাকে বলে

কোনো কিছুর স্বাভাবিক আওয়াজ বা ধ্বনির অনুকরণে গঠিত শব্দকে ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্তি বলে । যেমন— টিপ্ টিপ্ , টিক্ টিক্, শন্ শন্।

ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্ত শব্দ কয়েকটি উপায়ে গঠিত হয়

১. মানুষের ধ্বনির অনুকার : ভেউ ভেউ-মানুষের উচ্চ কান্নার ধ্বনি। এরূপ-ট্যা ট্যা, হি হি ইত্যাদি।

২. জীবজন্তুর ধ্বনির অনুকার : ঘেউ ঘেউ (কুকুরের ধ্বনি) এরূপ- মিউ মিউ (বিড়ালের ডাক), কুহু কুহু (কোকিলের ডাক), কা কা (কাকের ডাক)।

৩. বস্তুর ধ্বনির অনুকার : ঘচাঘচ (ধান কাটার শব্দ), মড়মড় (গাছ ভেঙে পড়ার শব্দ), ঝমঝম (বৃষ্টি পড়ার শব্দ; হু হু (বাতাস প্রবাহের শব্দ)।

৪. অনুভূতিজাত কাল্পনিক ধ্বনির অনুকার : ঝিকিমিকি (ঔজ্জ্বল্য), ঠা ঠা (রোদের তীব্রতা)। এরূপ-মিনমিন, পিটপিট, ঝি ঝি ইত্যাদি।

ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্তি গঠন

১. একই শব্দের অবিকৃত প্রয়োগ : ধব ধব, ঝন ঝন, পট পট।

২. প্রথম শব্দটির শেষে আ যোগ করে : গপাগপ, টপাটপ, পটাপট।

৩. দ্বিতীয় শব্দটির শেষে ই যোগ করে : ধরাধরি, ঝমঝমি, ঝনঝনি ।

৪. যুগ্মরীতিতে গঠিত ধ্বন্যাত্মক শব্দ : কিচির মিচির (পাখির বা বানরের শব্দ), টাপুর টুপুর (বৃষ্টিপতনের শব্দ), হাপুস হুপুস।।

৫. আনি প্রত্যয়যোগেও বিশেষ্য দ্বিরুক্তি গঠিত হয়- যেমন : পাখিটার ছটফটানি দেখলে কষ্ট হয়। তোমার বকবকানি আর ভালো লাগে না।

ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্ত শব্দের বিভিন্ন পদরূপে ব্যবহার

১. বিশেষ্য : বৃষ্টির ঝমঝমানি আমাদের অস্থির করে তোলে।

২. বিশেষণ : ‘নামিল নভে বাদল ছলছল বেদনায়।’

৩. ক্রিয়া : 'কলকলিয়ে উঠল সেথায় নারীর প্রতিবাদ।'

৪. ক্রিয়া বিশেষণ : ‘চিকচিক করে বালি কোথা নাহি কাদা।'

বিশিষ্টার্থক বাগধারায় দ্বিরুক্ত শব্দের প্রয়োগ

ছেলেটিকে চোখে চোখে রেখো। (সতর্কতা)

ভুলগুলো তুই আনরে বাছা বাছা। (ভাবের প্রগাঢ়তা)

থেকে থেকে শিশুটি কাঁদছে। (কালের বিস্তার)

লোকটা হাড়ে হাড়ে শয়তান। (আধিক্য)

খাঁচার ফাঁকে ফাঁকে, পরশে মুখে মুখে, নীরবে চোখে চোখে চায়

যুগ্মরীতিতে শব্দের দ্বিরুক্তি গঠন পদ্ধতি

যুগ্মরীতির দ্বিরুক্তি : একই শব্দকে কিঞ্চিত পরিবর্তন করে দ্বিতীয়বার ব্যবহার করার নাম যুগ্মরীতির দ্বিরুক্তি।

নিয়মাবলি :

১। শব্দের আদিস্বর পরিবর্তন করে - চুপ-চাপ, ধুম-ধাম, দ্রিম দ্রাম, মিট-মাট, টাপুর টুপুর ।

২। শব্দের অন্তস্বরের পরিবর্তন করে—মারামারি, কোলাকুলি, হাতাহাতি, সরাসরি।

৩। দ্বিতীয়বার ব্যবহারে শব্দের ব্যঞ্জনধ্বনির পরিবর্তনে – ছট-ফট, নিশ-পিশ, ভাত-টাত ৷

৪। সমার্থক শব্দযোগে— চাল-চলন, রীতি-নীতি, বন-জঙ্গল।

৫। ভিন্নার্থক শব্দযোগে —ছোট-বড়, আসা-যাওয়া, জন্ম-মৃত্যু।

৬। বিপরীতার্থক শব্দযোগে—ডাল-ভাত, তালা-চাবি, পথ-ঘাট, অলি-গলি।

৭। সহচর শব্দযোগে—কাপড়-চোপড়, হাতে-নাতে।

এই পোস্টগুলি আপনার ভাল লাগতে পারে:

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন