বীজগাণিতিয় রাশিমালার প্রাথমিক চার নিয়ম

পাটিগণিতে আমরা সংখ্যা ও সংখ্যার বৈশিষ্ট্য জেনে বিভিন্ন গাণিতিক সমস্যা সমাধান করেছি। জ্যামিতিতে বস্তুর আকৃতি সম্পর্কে জানবো । এ অধ্যায়ে আমরা গণিতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা বীজগণিত সম্পর্কে জানবো । গণিতের এই শাখার বৈশিষ্ট্য হলো অক্ষর প্রতীকের প্রয়োগ। অক্ষর প্রতীক ব্যবহার করে আমরা নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যার বদলে যেকোনো সংখ্যা বিবেচনা করতে পারি। দ্বিতীয়ত, অক্ষর অজানা পরিমাণের প্রতীক হিসেবে এবং সংখ্যার পরিবর্তে ব্যবহৃত হয় বিধায় সকল গাণিতিক প্রক্রিয়া মেনে বীজগণিতীয় রাশি গঠন করা হয়। গণিতের চারটি মৌলিক প্রক্রিয়া হলো যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ। বিয়োগ হচ্ছে যোগের বিপরীত প্রক্রিয়া আর ভাগ হচ্ছে গুণের বিপরীত প্রক্রিয়া। পাটিগণিতে কেবল ধনাত্মক চিহ্নযুক্ত সংখ্যা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বীজগণিতে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক উভয় চিহ্নযুক্ত সংখ্যা এবং সংখ্যাসূচক প্রতীকও ব্যবহার করা হয়। এ অধ্যায়ে বীজগণিতীয় প্রতীক, চলক, বীজগণিতীয় রাশি, বীজগণিতীয় রাশির প্রাথমিক চার নিয়ম যথা: যোগ , বিয়োগ , গুণ ও ভাগ অত্যন্ত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে ।

বীজগণিতীয় প্রতীক

পাটিগণিতে সংখ্যা প্রতীক বা অঙ্কগুলো ১,২,৩,৪,৫,৬,৭,৮,৯,০। বীজগণিতে ব্যবহৃত সংখ্যা প্রতীক বা অঙ্কগুলো 1, 2, 3, 4, 5, 6, 7, 8, 9, 0 । এ সব সংখ্যা প্রতীক দ্বারা যেকোনো সংখ্যা লেখা যায়। তবে, বীজগণিতে সংখ্যা প্রতীকের সাথে অক্ষর প্রতীকও ব্যবহার করা হয় । এটি বীজগণিতের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। বীজগণিতে a, b, c, P, 9, 1, x,y,z,......... ইত্যাদি অক্ষর দ্বারা জানা বা অজানা সংখ্যা বা রাশিকে প্রকাশ করা হয় ।

মনে করি, মলির কাছে কয়েকটি আম আছে। এখানে মলির কাছে কয়টি আম আছে তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি । তার কাছে যেকোনো সংখ্যক আম থাকতে পারে। তবে বীজগণিতীয় প্রতীকের সাহায্যে বলা যায়, তার কাছে x সংখ্যক আম আছে। x এর মান 5 হলে, মলির কাছে 5টি আম আছে ; x এর মান 10 হলে, মলির কাছে 10টি আম আছে, ইত্যাদি ।

চলক

অক্ষর প্রতীক x এর মান 5 বা 10 বা অন্য কোনো সংখ্যা হতে পারে। বীজগণিতে ধরনের অজ্ঞাত রাশি বা অক্ষর প্রতীককে চলক বলে । অতএব, x চলকের একটি উদাহরণ। এখানে চলক হিসেবে x প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে। x প্রতীকের পরিবর্তে y প্রতীক নয় কেন ? চলক হিসেবে x এর পরিবর্তে বা অন্য কোনো প্রতীকও ব্যবহার করা যায় ।
লক্ষ করুন:
* চলক এমন একটি প্রতীক যার মানের পরিবর্তন হয় ।
* চলকের মান নির্দিষ্ট নয়।
* চলক বিভিন্ন মান ধারণ করতে পারে ।

বীজগণিতীয় রাশি ও পদ

5x, 2x + 3y, 5x + 3y - z, 3b×c - y, 5x + 2y + 9x - y ইত্যাদি এক একটি বীজগণিতীয় রাশি । প্রক্রিয়া চিহ্ন ও সংখ্যাসূচক প্রতীক এর অর্থবোধক সংযোগ বা বিন্যাসকে বীজগণিতীয় রাশি বলা হয় । বীজগণিতীয় রাশির যে অংশ যোগ (+) ও বিয়োগ (-) চিহ্ন দ্বারা সংযুক্ত থাকে, এদের প্রত্যেকটিকে ঐ রাশির পদ বলা হয় । যেমন, 4x + 3y একটি রাশি । রাশিটিতে 4x ও 3y দুইটি পদ রয়েছে । এরা যোগ চিহ্ন দ্বারা যুক্ত। আবার, 5x + 3y ÷ c+ 4b × 2y রাশিতে 5x, 3y÷c, 4b × 2y তিনটি পদ আছে। 4x একটি একপদী, 2x + 3y একটি দ্বিপদী, a - 2b + 4c একটি ত্রিপদী রাশি ।

সদৃশ ও বিসদৃশ পদ

7a2bx, 8a2bx দুইটি বীজগণিতীয় রাশি । রাশি দুইটির পদগুলোর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে শুধুমাত্র সাংখ্যিক সহগে । এই পদ দুইটি সদৃশ পদ । এক বা একাধিক বীজগণিতীয় রাশির অন্তর্ভুক্ত যেসব পদের একমাত্র পার্থক্য রয়েছে সাংখ্যিক সহগে, তাদের সদৃশ পদ বলা হয় । অন্যথায় পদগুলো বিসদৃশ। যেমন, 9ax, 9ay রাশি দুইটির সাংখ্যিক সহগ একই, কিন্তু পদ দুইটি পৃথক ; তাই তারা বিসদৃশ ।

বীজগণিতীয় রাশির যোগ

দুই বা ততোধিক বীজগণিতীয় রাশি যোগ করতে হলে সদৃশ পদের সহগগুলো চিহ্নযুক্ত সংখ্যার নিয়মে যোগ করতে হবে । এরপর প্রাপ্ত সহগের ডানপাশে প্রতীকগুলো বসাতে হবে। বিসদৃশ পদগুলো তাদের চিহ্নসহ যোগফলে বসাতে হবে ।
উদাহরণ ১: যোগ কর :
2a+4b+5c, 3a+2b-6c.
সদৃশ পদগুলো তাদের স্ব-স্ব চিহ্নসহ নিচে নিচে লিখে পাই,
2a+4b+5c
3a+2b-6c
-----------------
5a+6b-c
নির্ণেয় যোগফল 5a +6b-c.
লক্ষ করুন : সদৃশ পদের সাংখ্যিক সহগগুলোর বীজগণিতীয় যোগফল নির্ণয় করা হয়েছে । প্রাপ্ত যোগফলের পাশে সংশ্লিষ্ট পদের প্রতীকগুলো বসানো হয়েছে। এভাবে প্রাপ্ত সব পদের যোগফলই নির্ণেয় যোগফল ।

বীজগণিতীয় রাশির বিয়োগ

a - b = a + (- b)
একটি বীজগণিতীয় রাশি থেকে অপর একটি বীজগণিতীয় রাশি বিয়োগ করার ক্ষেত্রে, প্রথম রাশির সাথে দ্বিতীয় রাশির যোগাত্মক বিপরীত রাশি যোগ করা হয় । অর্থাৎ, বিয়োজ্য বা দ্বিতীয় রাশির প্রতিটি পদের চিহ্ন পরিবর্তন করে প্রাপ্ত রাশিকে প্রথম রাশির সাথে যোগ করা।
উদাহরণ ২: 5a+4b5c থেকে 3a - 4b - 60 বিয়োগ কর।
সমাধান : বিয়োজ্যের প্রতিটি পদের চিহ্ন পরিবর্তন করে পাই
-3a+4b+6c এখন প্রথম রাশির সাথে রূপান্তরিত বিয়োজ্য রাশি যোগ করে পাই,
+5a+4b - 5c
-3a+4b+6c
-----------------
2a + 8b + c
নির্ণেয় বিয়োগফল 2a + 8b + c

বীজগণিতীয় রাশির গুণ

গুণ করার সময় একই চিহ্নযুক্ত দুইটি রাশির গুণফল (+) চিহ্নযুক্ত হবে এবং বিপরীত চিহ্নযুক্ত দুইটি রাশির গুণফল (-) চিহ্নযুক্ত হবে।

একপদী রাশিকে একপদী রাশি দ্বারা গুণ

দুইটি একপদী রাশির গুণের ক্ষেত্রে তাদের সাংখ্যিক সহগদ্বয়কে আগে গুণ করে নিতে হয়। তারপর উভয়পদে বিদ্যমান বীজগণিতীয় প্রতীকগুলোকে সূচক নিয়মে গুণ করে ( অর্থাৎ পাওয়ারে পাওয়ারে যোগ করে ) গুণফলে লিখতে হয়। অন্যান্য প্রতীকগুলো অপরিবর্তিত অবস্থায় গুণফলে নেওয়া হয়।
উদাহরণ ৩: 12 a 2 x y 2 কে – 6a x 3 b দ্বারা গুণ কর।
সমাধান : এখানে 12 ও -6 এর গুণফল -72 ।দুটি বিপরীত চিহ্নযুক্ত হওয়াতে 72 এর আগে ( - ) বসাতে হয়েছে।
এখন a 2 কে a দ্বারা গুণ করলে হয় a 3 । কারণ পাওয়ারে পাওয়ারে যোগ হয়। তেমনিভাবে হবে x 4 , y 2 এবং b । সুতরাং গুণফল = -72 a 3 b x 4 y 2

বহুপদী রাশিকে একপদী রাশি দ্বারা গুণ

একের অধিক পদযুক্ত বীজগণিতীয় রাশিই বহুপদী রাশি। যেমন, 5 x 2 y + 7x y 2 একটি বহুপদী রাশি । বহুপদী রাশিকে একপদী রাশি দ্বারা গুণ করতে হলে বহুপদী রাশির প্রত্যেক পদকে একপদী রাশি দ্বারা আলাদা আলাদাভাবে গুণ করতে হয়। উদাহরণ ৪: (5 x 2 y + 7x y 2 ) x 5 x 3 y 3 । সমাধান : একপদী রাশি 5 x 3 y 3 দ্বারা বহুপদী রাশির প্রথম পদ 5 x 2 y কে গুণ করলে গুণফল হয় = 25 x 5 y 4 । আবার একপদী রাশি 5 x 3 y 3 দ্বারা বহুপদী রাশির দ্বিতীয় পদ 7x y 2 কে গুণ করলে গুণফল হয় = 35 x 4 y 5 । নির্ণেয় গুণফল = 25 x 5 y 4 + 35 x 4 y 5

বহুপদী রাশিকে বহুপদী রাশি দ্বারা গুণ

বহুপদী রাশিকে বহুপদী রাশি দ্বারা গুণ করতে হলে গুণ্যের প্রত্যেক পদকে গুণকের প্রত্যেক পদ দ্বারা আলাদা আলাদাভাবে গুণ করে সদৃশ পদগুলোকে নিচে নিচে সাজিয়ে লিখতে হয়। চিহ্নযুক্ত রাশির যোগের নিয়মে যোগ করতে হয়। বিসদৃশ পদ থাকলে সেগুলোকে পৃথকভাবে লিখতে হয় এবং গুণফলে বসাতে হয়।
গুণের নিয়ম :
প্রথমে গুণ্যের প্রত্যেক পদকে গুণকের প্রথম পদ দ্বারা গুণ করে গুণফল লিখতে হবে।
এরপর গুণ্যের প্রত্যেক পদকে গুণকের দ্বিতীয় পদ দ্বারা গুণ করে গুণফল বের করতে হবে।
এ গুণফলকে এমনভাবে সাজিয়ে লিখতে হবে যেন উভয় গুণফলের সদৃশ পদগুলো নিচে নিচে পড়ে।
প্রাপ্ত দুইটি গুণফলের বীজগণিতীয় সমষ্টিই হলো নির্ণেয় গুণফল।
উদাহরণ ৫: 3x + 2y কে x + y দ্বারা গুণ কর ।
সমাধান: প্রথমে x দ্বারা 3x ও 2y কে গুণ করতে হবে। তারপর y দ্বারা 3x ও 2y কে গুণ করতে হবে ।অত:পর সদৃশপদগুলো যোগ করে গুণফল লিখতে হবে।
নির্ণেয় গুণফল = (3x + 2y)( x + y) = 3 x 2 + 2xy + 3xy + 2 y 2 = 3 x 2 + 5xy + 2 y 2

বীজগণিতীয় রাশির ভাগ

একপদী রাশিকে একপদী রাশি দ্বারা ভাগ

একপদী রাশিকে একপদী রাশি দ্বারা ভাগ করতে হলে, সাংখ্যিক সহগকে পাটিগণিতীয় নিয়মে ভাগ এবং বীজগণিতীয় প্রতীককে সূচক নিয়মে ( অর্থাৎ পাওয়ারে পাওয়ারে বিয়োগ করে ) ভাগ করতে হয়।
উদাহরণ ৬: 10 a 5 b 7 কে 5 a 2 b 3 দ্বারা ভাগ কর।
10 a 5 b 7 ÷5 a 2 b 3 = 2a (5-2) b (7-3) = 2a 3 b 4

বহুপদী রাশিকে একপদী রাশি দ্বারা ভাগ

বহুপদী রাশিকে একপদী রাশি দ্বারা ভাগ করতে হলে বহুপদী রাশির প্রত্যেক পদকে একপদী রাশি দ্বারা আলাদা আলাদাভাবে ভাগ করতে হয়।
উদাহরণ ৭: 10 x 5 y 3 - 12 x 3 y 8 + 6 x 4 y 7 কে 2 x 2 y 2 দ্বারা ভাগ কর।
( 10 x 5 y 3 - 12 x 3 y 8 + 6 x 4 y 7 ) ÷ 2 x 2 y 2 = 5 x 3 y – 6 x y 7 + 3 x 2 y 5

বহুপদী রাশিকে বহুপদী রাশি দ্বারা ভাগ

বহুপদী রাশিকে বহুপদী রাশি দ্বারা ভাগ করার ক্ষেত্রে প্রথমে ভাজ্য ও ভাজক উভয়ের মধ্যে আছে এমন একটি বীজগণিতীয় প্রতীকের ঘাতের অধঃক্রম অনুসারে রাশিদ্বয়কে সাজাতে হবে। যেমন x 2 + 2 x 4 + 110 - 48x একটি বহুপদী। একে x এর মানের অধঃক্রম অনুসারে সাজালে আমরা পাই : 2 x 4 + x 2 -48x + 110। এরপর পাটিগণিতের ভাগ প্রক্রিয়ার মতো নিচের নিয়মে ধাপে ধাপে ভাগ করতে হবে।
• ভাজ্যের প্রথম পদটিকে ভাজকের প্রথম পদ দ্বারা ভাগ করলে যে ভাগফল হয় তা নির্ণেয় ভাগফলের প্রথম পদ ।
• ভাগফলের ঐ প্রথম পদ দ্বারা ভাজকের প্রত্যেক পদকে গুণ করে গুণফল সদৃশ পদ অনুযায়ী ভাজ্যের নিচে বসিয়ে ভাজ্য থেকে বিয়োগ করতে হয়।
• বিয়োগফল নতুন ভাজ্য হবে। বিয়োগফল এমনভাবে লিখতে হবে যেন তা আগের মতো বিবেচ্য প্রতীকের অধঃক্রম অনুসারে থাকে ।
• নতুন ভাজ্যের প্রথম পদটিকে ভাজকের প্রথম পদ দ্বারা ভাগ করলে যে ভাগফল হয় তা নির্ণেয় ভাগফলের দ্বিতীয় পদ । এভাবে ক্রমান্বয়ে ভাগ করতে হয়।
উদাহরণ ৮: 6 x 2 + x - 2 কে 2x-1 দ্বারা ভাগ কর।
সমাধান : এখানে ভাজ্য ও ভাজক উভয়েই x এর ঘাতের অধঃক্রম অনুসারে সাজানো আছে।
2x - 1 ) 6 x 2 + x - 2 ( 3x + 2
6 x 2 + x
--------------------------------------
4x - 2
4x - 2
--------------------------------------
0
নির্ণেয় ভাগফল 3x + 2.
এখানে, 6 x 2 ÷ 2x = 3x.
এই 3x দ্বারা ভাজক 2x-1 কে গুণ করে গুণফল ভাজ্যের সদৃশ পদের নিচে লিখে বিয়োগ করা হল । নতুন ভাজ্য 4x-2 এর ক্ষেত্রে একই নিয়ম অনুসরণ করা হল।

أحدث أقدم