“সংখ্যায়ন” অধ্যায়: মৌলিক সূত্রাবলি, সমাধান ও সহজ কৌশলের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা

প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা যেমন—বিসিএস, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ, ব্যাংক, এনএসআই কিংবা বিভিন্ন সরকারি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার গণিত অংশে ভালো করার মূল চাবিকাঠি হলো গণিতের মৌলিক ধারণা স্পষ্ট রাখা এবং সময়ের সাশ্রয় করা। পাটিগণিতে “সংখ্যায়ন” বা সংখ্যা সংক্রান্ত অধ্যায়টি কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং এটি সমগ্র পাটিগণিতের প্রাণশক্তি। বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংখ্যা সম্পর্কিত কিছু নির্দিষ্ট ছন্দের ও ধরনের অংক প্রায় প্রতিটি পরীক্ষায় ঘুরেফিরে আসতে দেখা যায়।

সংখ্যা বিষয়ক এসব অংক সমাধান করার জন্য অনেকেই কেবল মুখস্থ 'শর্টটেকনিক' বা সংক্ষিপ্ত সূত্রের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু পরীক্ষার হলে একটু ঘুরিয়ে প্রশ্ন আসলে বা প্রশ্নকর্তা সামান্য কৌশল বদলালে শর্টটেকনিক মনে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই গণিতে পূর্ণ নম্বর নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি অংকের মূল লিখিত নিয়ম (Formal Solution) জানা বাধ্যতামূলক, যার পর পরীক্ষার হলে সময় বাঁচাতে সংক্ষিপ্ত সূত্র বা শর্টটেকনিক (Shortcut Formula) প্রয়োগ করতে হয়।

এই নিবন্ধে আমরা সংখ্যা সম্পর্কিত গণিতের বিভিন্ন সূত্র, এগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা, প্রতিটি সূত্রের জন্য গাণিতিক উদাহরণ (লিখিত ও সূত্রভিত্তিক উভয় নিয়মে সমাধানসহ) এবং সূত্রের বাইরে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গাণিতিক প্রশ্নের বিস্তারিত সমাধান নিয়ে আলোচনা করব।

ক্রমিক সংখ্যার বর্গের অন্তর

পরপর দুটি পূর্ণসংখ্যাকে ক্রমিক সংখ্যা বলে (যেমন: x এবং x + 1)। এদের বর্গের পার্থক্য দেওয়া থাকলে নিম্নোক্ত সূত্র দুটি প্রয়োগ করে খুব সহজেই সংখ্যা দুটি বের করা যায়।

সূত্র-১: দুইটি ক্রমিক সংখ্যার বর্গের অন্তর (বা পার্থক্য) দেওয়া থাকলে, বড় সংখ্যা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে:

বড় সংখ্যা = বর্গের অন্তর + ১ ২

সূত্র-২: দুইটি ক্রমিক সংখ্যার বর্গের অন্তর (বা পার্থক্য) দেওয়া থাকলে, ছোট সংখ্যা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে:

ছোট সংখ্যা = বর্গের অন্তর - ১ ২

প্রশ্ন-১: দুটি ক্রমিক পূর্ণ বর্গসংখ্যার বর্গের অন্তর ৯৩ হলে সংখ্যাদ্বয় কত?

মূল নিয়ম (লিখিত সমাধান):

ধরি, ছোট সংখ্যাটি = x
তাহলে, বড় সংখ্যাটি হবে = x + ১
প্রশ্নমতে,
( x + ১)2 − x2 = ৯৩
⇒ x2 + ২x + ১ − x2 = ৯৩
⇒ ২x + ১ = ৯৩
⇒ ২x = ৯৩ − ১
⇒ ২x = ৯২
⇒ x = ৯২ ২
⇒ x = ৪৬
অতএব, ছোট সংখ্যাটি x = ৪৬
এবং বড় সংখ্যাটি x + ১ = ৪৬ + ১ = ৪৭
∴ সংখ্যাদ্বয় যথাক্রমে ৪৬ এবং ৪৭

সূত্রের সাহায্যে সমাধান (শর্ট টেকনিক):
এখানে বর্গের অন্তর = ৯৩

ছোট সংখ্যা = বর্গের অন্তর − ১ ২
= ৯৩ − ১ ২
= ৯২ ২
= ৪৬

বড় সংখ্যা = বর্গের অন্তর + ১ ২
= ৯৩ + ১ ২
= ৯৪ ২
= ৪৭
∴ সংখ্যাদ্বয় যথাক্রমে ৪৬ এবং ৪৭

প্রশ্ন-২: দুইটি ধারাবাহিক বা ক্রমিক সংখ্যার বর্গের পার্থক্য ৩৩। ক্ষুদ্রতম বা ছোট সংখ্যাটি কত হবে?

মূল নিয়ম (লিখিত সমাধান):

ধরি, ছোট সংখ্যাটি = x
তাহলে, বড় সংখ্যাটি হবে = x + ১
প্রশ্নমতে,
( x + ১)2 − x2 = ৩৩
⇒ x2 + ২x + ১ − x2 = ৩৩
⇒ ২x + ১ = ৩৩
⇒ ২x = ৩৩ − ১
⇒ ২x = ৩২
⇒ x = ৩২ ২
⇒ x = ১৬
অতএব, ক্ষুদ্রতম বা ছোট সংখ্যাটি x = ১৬

সূত্রের সাহায্যে সমাধান (শর্ট টেকনিক):
এখানে বর্গের অন্তর = ৩৩

ছোট সংখ্যা = বর্গের অন্তর − ১ ২
= ৩৩ − ১ ২
= ৩২ ২
= ১৬
অতএব, ক্ষুদ্রতম বা ছোট সংখ্যাটি x = ১৬

যত বড়.....তত ছোট/ যত ছোট .... তত বড় উল্লেখ থাকলে

যখন কোনো সংখ্যা দুটি নির্দিষ্ট সংখ্যার ঠিক মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে, তখন প্রথম সংখ্যাটি থেকে সেটির ব্যবধান এবং দ্বিতীয় সংখ্যাটি থেকে সেটির ব্যবধান সমান হয়। ফলে নির্ণেয় সংখ্যাটি মূলত প্রদত্ত সংখ্যা দুটির গড় নির্দেশ করে।

সূত্র-৩: যত বড়.....তত ছোট/ যত ছোট .... তত বড় উল্লেখ থাকলে, সংখ্যাটি নির্ণয়ের ক্ষেত্রে--,

সংখ্যাটি = প্রদত্ত সংখ্যা দুটির যোগফল ২

প্রশ্ন-১: একটি সংখ্যা ৬৫০ থেকে যত বড় ৮২০ থেকে তত ছোট। সংখ্যাটি কত?

মূল নিয়ম (লিখিত সমাধান):

ধরি, নির্ণেয় সংখ্যাটি = x
সংখ্যাটি ৬৫০ থেকে যত বড়, অর্থাৎ ব্যবধান = (x - ৬৫০)
সংখ্যাটি ৮২০ থেকে তত ছোট, অর্থাৎ ব্যবধান = (৮২০ - x)
প্রশ্নমতে,
x - ৬৫০ = ৮২০ - x
বা, x + x = ৮২০ + ৬৫০
বা, 2x = ১৪৭০
বা, x = ১৪৭০ ২
বা, = ৭৩৫
∴ সংখ্যাটি ৭৩৫

সূত্রের সাহায্যে সমাধান (শর্ট টেকনিক):

নির্ণেয় সংখ্যা = ১ম সংখ্যা + ২য় সংখ্যা ২
= ৬৫০ + ৮২০ ২
= ১৪৭০ ২
= ৭৩৫
∴ সংখ্যাটি ৭৩৫

প্রশ্ন-২: একটি সংখ্যা ৯৯৯ থেকে যত ছোট ৭৯৭ থেকে তত বড়। সংখ্যাটি কত?

মূল নিয়ম (লিখিত সমাধান):

ধরি, নির্ণেয় সংখ্যাটি = x
সংখ্যাটি ৭৯৭ থেকে যত বড়, অর্থাৎ ব্যবধান = (x - ৭৯৭)
সংখ্যাটি ৯৯৯ থেকে তত ছোট, অর্থাৎ ব্যবধান = (৯৯৯ - x)
প্রশ্নমতে,
x - ৭৯৭ = ৯৯৯ - x
বা, x + x = ৯৯৯ + ৭৯৭
বা, 2x = ১৭৯৬
বা, x = ১৭৯৬ ২
বা, = ৮৯৮
∴ সংখ্যাটি ৮৯৮

সূত্রের সাহায্যে সমাধান (শর্ট টেকনিক):

নির্ণেয় সংখ্যা = ১ম সংখ্যা + ২য় সংখ্যা ২
= ৭৯৭ + ৯৯৯ ২
= ১৭৯৬ ২
= ৮৯৮
∴ সংখ্যাটি ৮৯৮

গুণফল ও একটি সংখ্যা থেকে অপর সংখ্যা

দুটি সংখ্যার গুণফলের মূল নীতি হলো ১ম সংখ্যা × ২য় সংখ্যা = গুণফল। সুতরাং, গুণফলকে যেকোনো একটি সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে অপর সংখ্যাটি পাওয়া যায়।

সূত্র-৪: দুটি সংখ্যার গুণফল এবং একটি সংখ্যা দেওয়া থাকলে অপর সংখ্যাটি নির্ণয়ের ক্ষেত্রে-

অপর সংখ্যাটি = দুইটি সংখ্যার গুণফল একটি সংখ্যা

প্রশ্ন-১: ২টি সংখ্যার গুণফল ৮.৮। একটি সংখ্যা ২.৭৫ হলে, অপর সংখ্যাটি কত?

মূল নিয়ম (লিখিত সমাধান):

ধরি, অপর সংখ্যাটি = y
প্রশ্নমতে, একটি সংখ্যা × অপর সংখ্যা = গুণফল
বা, ২.৭৫ × y = ৮.৮
বা, y = ৮.৮ ২.৭৫
বা, y = ৩.২
∴ অপর সংখ্যাটি = ৩.২

সূত্রের সাহায্যে সমাধান (শর্ট টেকনিক):

অপর সংখ্যাটি = দুইটি সংখ্যার গুণফল একটি সংখ্যা
= ৮.৮ ২.৭৫
= ৩.২
∴ অপর সংখ্যাটি = ৩.২

প্রশ্ন-২: দুটি সংখ্যার গুণফল ২৩০৪। একটি সংখ্যার ৪ গুণ ৯৬ হলে, অপর সংখ্যাটি কত?

মূল নিয়ম (লিখিত সমাধান):

ধরি, প্রথম সংখ্যাটি = x এবং অপর সংখ্যাটি = y
দেওয়া আছে, প্রথম সংখ্যার ৪ গুণ = ৯৬
∴ প্রথম সংখ্যাটি = ৯৬ ÷ ৪ = ২৪
আবার, দুটি সংখ্যার গুণফল = ২৩০৪
প্রশ্নমতে, x × y = ২৩০৪
বা, ২৪ × y = ২৩০৪
বা, y = ২৩০৪ ২৪ = ৯৬
∴ অপর সংখ্যাটি ৯৬।

সূত্রের সাহায্যে সমাধান (শর্ট টেকনিক):

এখানে, একটি সংখ্যা = ৯৬ ÷ ৪ = ২৪

অপর সংখ্যাটি = দুইটি সংখ্যার গুণফল একটি সংখ্যা
= ২৩০৪ ২৪
= ৯৬
∴ অপর সংখ্যাটি = ৯৬

সংখ্যা সম্পর্কিত আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও সমাধান

সংখ্যা সংক্রান্ত সকল অংক কিন্তু সরাসরি ওপরের ৪টি সূত্রের মাধ্যমে সমাধান করা যায় না। কিছু অংক বীজগাণিতিক অনুপাত, মান নির্ণয়, লঘিষ্ঠ সাধারণ গুণনীয়ক (ল.সা.গু) কিংবা ভগ্নাংশের নিয়মের ওপর প্রতিষ্ঠিত। নিচে এরকম কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের লিখিত সমাধান ও বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:

প্রশ্ন-১: একটি সংখ্যার তিনগুণের সাথে দ্বিগুণ যোগ করলে ৯০ হয়। সংখ্যাটি কত ?

উত্তরঃ (গ) ১৮

সমাধান:
ধরি, সংখ্যাটি = ‘ক’
প্রশ্নমতে, ৩ক+২ক = ৯০
বা, ৫ক = ৯০
বা,ক = ৯০÷৫=১৮
সুতরাং সংখ্যাটি = ১৮

প্রশ্ন-২: একটি ঋণাত্মক সংখ্যার দ্বিগুণের বর্গের সাথে ১৫ যোগ করলে ৪১৫ হয়। সংখ্যাটি কত ?

উত্তরঃ (খ) ১০

সমাধান:
ধরি, ঋণাত্মক সংখ্যাটি = -ক
প্রশ্নমতে, (-২ক) ২ +১৫ = ৪১৫
বা , (২ক) ২ = ৪১৫-১৫
বা, (২ক) ২ = ৪০০
বা, (২ক) ২ = (২০) ২
বা, ২ক = ২০
বা,ক = ১০
সুতরাং সংখ্যাটি = ১০

প্রশ্ন-৩: দু’টি সংখ্যার বর্গের সমষ্টি ৪১, সংখ্যা দু’টির গুণফল ২০। সংখ্যা দু’টির বর্গের বিয়োগফল কত ?

উত্তরঃ (খ) ৯

সমাধান:
মনে করি , সংখ্যা দুটি যথাক্রমে a ও b ।
প্রশ্নমতে, a 2 + b 2 = ৪১ আবার, ab = ২০
আমরা জানি, (a+b) 2 = a 2 + b 2 + 2ab
বা, (a+b) 2 = ৪১ + ২ × ২০
বা, (a+b) 2 = ৮১
বা, (a+b) 2 = (৯) ২
বা, a+b = ৯
আবার, (a - b) 2 = a 2 + b 2 - 2ab
বা, (a-b) 2 = ৪১ - ২ × ২০
বা, (a-b) 2 = ৪১ - ৪০
বা, (a-b) 2 = ১
বা, a-b = ১
সুতরাং a 2 - b 2 = (a+b)(a-b)
বা, a 2 - b 2 = ৯ × ১ = ৯
অর্থাৎ সংখ্যা দু’টির বর্গের বিয়োগফল = ৯

মুখে মুখে সমাধান : এখানে, ৪ ২ + ৫ ২ = ৪১ আবার, ৪×৫ = ২০।
সুতরাং সংখ্যা দু’টি হচ্ছে ৪ ও ৫।
তাই সংখ্যা দু’টির বর্গের বিয়োগফল = ৫ ২ - ৪ ২ = ৯।

প্রশ্ন-৪: পরপর দশটি সংখ্যার প্রথম ৫টির যোগফল ৫৬০ হলে,শেষ ৫টির যোগফল কত ?

উত্তরঃ (খ) ৫৮৫

সমাধান:
মনে করি,
প্রথম সংখ্যাটি = x
প্রশ্নমতে , x+x+ ১+x+ ২+x+ ৩+x+ ৪ = ৫৬০
বা, ৫x+১০ = ৫৬০
বা, ৫x = ৫৫০
বা, x = ১১০
.’. শেষ ৫ টি সংখ্যার যোগফল
= x+৫+x+৬+x+৭+x+৮+x+৯
= ৫x+৩৫
= (৫×১১০)+৩৫ [ x এর মান ১১০ বসিয়ে]
= ৫৮৫
অথবা
মুখে মুখে সমাধান: এরকম থাকলে শেষ পদসংখ্যাকে বর্গ করে প্রথম যোগফলের সাথে যোগ করলেই শেষ সংখ্যা গুলোর যোগফল পাওযা যাবে।যেমন ৫ ২ = ২৫।
সুতরাং শেষ ৫টির যোগফল = ৫৬০ + ২৫ = ৫৮৫


    নবীনতর পূর্বতন