রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর




রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)


বিবিসির জরিপে (২০০৪) সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় ২য় স্থান প্রাপ্ত নোবেল জয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভা, সব্যসাচী লেখক, কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, সঙ্গীত রচয়িতা, সুরস্রষ্টা, গায়ক, চিত্রশিল্পী, অভিনেতা, সমাজসেবী, শিক্ষাবিদ, গ্রামীণ ক্ষুদ্রঋণ ও গ্রাম উন্নয়ন প্রকল্পের পথিকৃৎ। ১৯৩০ সালে জার্মানিতে আইনস্টাইনের সাথে সাক্ষাৎ হয়। সাক্ষাতে তিনি দর্শন, মানুষ ও বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করেন। বাংলাদেশের শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ), শিলাইদহ (কুষ্টিয়া), পতিশ্বর (নওগাঁ) ইত্যাদি তাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থান।

 

 

সাহিত্যিক উপাদান

সাহিত্যিক তথ্য

জন্ম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৭ মে, ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে (বাংলা- ২৫ বৈশাখ, ১২৬৮) কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকী পালিত হয় ১৯৬১ সালে।

পারিবারিক পরিচিতি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ- প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, পিতামহি- দিগম্বরী দেবী, পিতা- দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মাতা- সারদা দেবী। তিনি পিতা-মাতার ১৫জন সন্তানের মধ্যে ১৪তম সন্তান এবং ৮ম পুত্র।

বিবাহ

তিনি ৯ ডিসেম্বর, ১৮৮৩ সালে ঠাকুরবাড়ীর অধস্তন কর্মচারী বেণীমাধব রায় চৌধুরীর কন্যা ভবতারিণী দেবীকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর রবীন্দ্রনাথ নাম রাখেন মৃণালিনী দেবী । স্ত্রী ভবতারিণী দেবী খুলনার দক্ষিণডিহি গ্রামের মেয়ে ।

সম্পাদনা

তিনি ‘সাধনা’ (১৮৯৪), ‘ভারতী' (১৮৯৮), ‘বঙ্গদর্শন’ (১৯০১), ‘তত্ত্ববোধিনী' (১৯১১) পত্রিকা সম্পাদনা করেন ।

সাহিত্যিক ভাবধরা

সাহিত্যিক জীবনের শুরুতে তিনি বিহারীলাল চক্রবর্তীর অনুসারী ছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যে মধ্যযুগীয় বৈষ্ণব পদাবলি, উপনিষদ, দোঁহাবলি, লালনের বাউল গান ও রামপ্রসাদ সেনের শাক্ত পদাবলির প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

রাখিবন্ধন’

হিন্দু-মুসলমান মিলনের লক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ ‘রাখিবন্ধন’ উৎসবের সূচনা করেন।

শ্রেষ্ঠ কাব্য

তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্য সংকলনের নাম ‘সঞ্চয়িতা'।

‘নাইটহুড’

ব্রিটিশ সরকার ৩ জুন, ১৯১৫ সালে রবীন্দ্রনাথকে ‘নাইটহুড’ বা ‘স্যার' উপাধি প্রদান করেন। পরবর্তীতে ১৩ এপ্রিল, ১৯১৯ সালে পাঞ্জাবের অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তা বর্জন করেন।

বংশ পরিচয়

পিরালি ব্রাহ্মণ [বিধর্মীদের সংস্পর্শে এসে জাত হারানো ব্রাহ্মণরা হলেন পিরালি ব্রাহ্মণ]। (পারিবারিক উপাধি কুশারি)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষ জগন্নাথ কুশারি পিরালি ব্রাহ্মণ মেয়ে বিয়ে করলে হিন্দু ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয় এবং সমাজচ্যুত করা হয়। তার ছেলে পঞ্চানন কুশারি ১৮ শতকের শুরুতে খুলনার দক্ষিণডিহি থেকে কলকাতার গোবিন্দপুরে এসে জেলে পাড়ার পুরোহিতের কাজ করা শুরু করেন। ফলে অনেকে ঠাকুর বলে ডাকেন । এছাড়াও ইংরেজদের বাণিজ্য তরীতে দ্রব্য উঠা-নামার কাজ করলে ইংরেজরাও তাকে ঠাকুর বলে ডাকতেন। তারই উত্তর প্রজন্ম দ্বারকানাথ ঠাকুর ইংরেজদের কাছ থেকে অর্থের পাশাপাশি 'প্রিন্স' উপাধি লাভ করেন। ক্রমান্বয়ে শত বছরের ব্যবধানে জেলে সম্প্রদায়ের পুরোহিত থেকে কলকাতার প্রভাবশালী পরিবারে পরিণত হয়।

ছদ্মনাম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মোট ৯টি ছদ্মনাম পাওয়া যায়। যথা: ভানুসিংহ ঠাকুর, অকপট চন্দ্র ভাস্কর, আন্নাকালী পাকড়াশী, ষষ্ঠীচরণ দেবশর্মা, বানীবিনোদ বিদ্যাবিনোদ, শ্রীমতি কনিষ্ঠা শ্রীমতি মধ্যমা, দিকশূন্য ভট্টাচার্য, নবীন কিশোর শর্মন।

উপাধি

রবীন্দ্রনাথকে যারা যেসব উপাধিতে ভূষিত করেন:

গুরুদেব- মহাত্মা গান্ধী, কবিগুরু - ক্ষিতিমোহন সেন, বিশ্বকবি- ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়

পদক প্রাপ্তি

রবীন্দ্রনাথ যেখান থেকে যেসব  পদক পান:

ডি. লিট- ১৯১৩ ( কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়), ডি. লিট ১৯৩৫ ( কাশী বিশ্ববিদ্যালয়), ডি. লিট- ১৯৩৬ ( ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), ডি. লিট- ১৯৪০ (অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়)।

ব্রহ্মচর্যাশ্রম

ব্রহ্মচর্যাশ্রম ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতন (বোলপুরে) প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে এটি

১৯২১ সালে ‘বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়' এ রূপান্তরিত হয়।

রবীন্দ্রনাথের প্রথম প্রকাশিত রচনাবলির নাম

প্রথম প্রকাশিত কবিতা

‘হিন্দু মেলার উপহার' (২৫/০২/১৮৭৪): তাঁর মাত্র ১৩ বছর বয়সে কবিতাটি অমৃতবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয় [সূত্র : বাংলা একাডেমি চরিতাভিধান] ।

 

অভিলাষ' (১৮৭৪): এটি প্রকাশিত হয় ‘তত্ত্ববোধিনী' পত্রিকায়।[সূত্র: বাংলাপিডিয়া]। তিনি মাত্র ৮ বছর বয়সে কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন ।

প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ

‘কবি-কাহিনী' (১৮৭৮), এটি তাঁর ১৭ বছর বয়সে প্রকাশিত হয়। এ কাব্যের কবিতাগুলি ‘ভারতী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

প্রথম অপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ

‘পৃথ্বীরাজের পরাজয়’। ১২৭৯ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন মাসে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বাবার সাথে বোলপুর- শান্তিনিকেতনে যান এবং সেখানেই বীররসাত্মক এ কাব্য রচনা করেন। এ কাব্যটি সম্পর্কে তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’তে বিস্তারিত পাওয়া যায়।

প্রথম প্রকাশিত কবিতার লাইন

মীনগণ দীন হয়ে ছিল সরোবরে

এখন তাহারা সুখে জলে ক্রীড়া করে ৷

প্রথম প্রকাশিত নাটক

‘বাল্মীকি প্রতিভা' (১৮৮১), এটি তাঁর গীতিনাট্য। অধিকাংশের মতে, রবীন্দ্রনাথের প্রথম প্রকাশিত নাটক ‘রুদ্রচণ্ড' (১৮৮১)। কিন্তু ‘রুদ্রচণ্ড’ নাটক নয়, নাটিকা। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বাল্মীকির ভূমিকায় অভিনয় করেন।

প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস

‘বৌ ঠাকুরানীর হাট’ (১৮৮৩):  এটি ঐতিহাসিক উপন্যাস। উৎসর্গ করেন সৌদামিনী দেবীকে।

প্রথম প্রকাশিত ছোটগল্প

ভিখারিনী’ (১৮৭৭)

প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ

বিবিধপ্রসঙ্গ' (১৮৮৩)

প্রথম প্রকাশিত রচনা সংকলন

চয়নিকা’ (১৯০৯)

প্রথম সম্পাদিত পত্রিকা

সাধনা’ (১৮৯৪)

সর্বশেষ প্রকাশিত ছোটগল্প

ল্যাবরেটরী' (১৯৪০)

সর্বশেষ রচিত গল্প

‘মুসলমানীর গল্প’

২য় কাব্যগ্রন্থ

রবীন্দ্রনাথের প্রকাশিত ২য় কাব্যগ্রন্থের নাম ‘বনফুল' (১৮৮০): এটি রবীন্দ্রনাথ রচিত প্রথম সম্পূর্ণ কাব্য। কিন্তু প্রকাশের দিক দিয়ে দ্বিতীয়। গ্রন্থাগারে প্রকাশিত হওয়ার ৪ বছর পূর্বে অর্থাৎ ১৫ বছর বয়সে রচনা করেন। এ কাব্যের কবিতাগুলি ১৮৭৬ সালেই 'জ্ঞানাঙ্কুর’ ও ‘প্রতিবিম্ব’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। কিন্তু গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৮৮০ সালে। তাই ‘বনফুল’কে প্রথম কাব্যগ্রন্থ বলা যায় না। যদিও অনেকে এটিকে প্রথম কাব্যগ্রন্থ বলে থাকেন কিন্তু তা সঠিক নয়। এ কাব্যের উল্লেখযোগ্য চরিত্র: বিজয়, কমলা, নীরদ, নীরজা । [সূত্র: বাংলা একাডেমি চরিতাভিধান]

‘গীতাঞ্জলি’

গীতাঞ্জলি' কাব্য ১৯১০ সালে প্রকাশিত হয়।গীতাঞ্জলির অনুবাদ Song Offerings নামে ১৯১২ সালে ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত হয় । Song Offerings এর ভূমিকা লেখেন ইংরেজ কবি (জাতিতে আইরিশ) W.B Yeats.

নোবেল পুরস্কার

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘গীতাঞ্জলি' কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল পুরস্কার পাননি। তিনি ১৯১৩ সালের নভেম্বর মাসে নোবেল পুরস্কার পান ‘গীতাঞ্জলি'র ইংরেজি অনুবাদ Song Offerings এর জন্য। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সময় তাঁর বয়স ছিল ৫২ বছর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রথম ভারতীয় এবং সাহিত্যে একমাত্র নোবেলজয়ী বাঙালি । ২৪ মার্চ, ২০০৪ সালে শান্তি নিকেতন থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল চুরি হয়ে যায়।

প্রথম জীবনের উল্লেখযোগ্য কবিতা

রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনের উল্লেখযোগ্য কবিতা. ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ' (আজি এ প্রভাতে রবির কর / কেমনে পশিল প্রাণের 'পর) ।

রবীন্দ্রনাথের প্রধান কাব্যগ্রন্থগুলোর নাম

রবীন্দ্রনাথের প্রধান কাব্যগ্রন্থগুলোর নাম:

রবীন্দ্রনাথের মোট কাব্যগ্রন্থ ৫৬টি।

‘কবি-কাহিনী' (১৮৭৮) : প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ, যা অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত। চার সর্গে বিভক্ত এ কাব্যের নায়ক কবি এবং নায়িকা নলিনী। নলিনীর মৃত্যুর পর নায়ক কবির বিশ্বপ্রেমের উপলব্ধিতে কাব্যের সমাপ্তি। ধরে নেয়া হয়, এ কাব্যের নায়ক রবীন্দ্রনাথ নিজেই ।

 

প্রভাতসঙ্গীত' (১৮৮৩): কাব্যগ্রন্থটিতে মোট ২১টি কবিতা আছে । উল্লেখযোগ্য কবিতা: নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ ।

 

‘কড়ি ও কোমল' (১৮৮৬): তারুণ্যের উচ্ছ্বলতা, নারীদেহের প্রতি মুগ্ধতা ও মৃত্যুর রহস্যময়তার প্রতি আকর্ষণ এ কাব্যের বৈশিষ্ট্য। ৯ ডিসেম্বর, ১৮৮৩ সালে রবীন্দ্রনাথ বিয়ে করলে ১৯ এপ্রিল, ১৮৮৪ সালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের পত্নী প্রায় সমবয়সী বৌঠান কাদম্বরী দেবী আত্মহত্যা করেন। রবীন্দ্রমনন ও রবীন্দ্রপ্রতিভার বিকাশে কাদম্বরী দেবীর অসামান্য অবদান রবীন্দ্রনাথ আমৃত্যু ভুলতে পারেননি। বৌদির আত্মহত্যাজনিত মৃত্যু কবির মনে যে বিরাগের সৃষ্টি করেছিল, তাঁর প্রভাব এ কাব্যগ্রন্থে আছে। উল্লেখযোগ্য কবিতা: চুম্বন, বাহু, চরণ, মোহ।

 

‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলি' (১৮৮৪): ব্রজবুলি ভাষায় রচিত গীতিকাব্য সংকলন। 'প্রাচীন কাব্য সংগ্রহ' গ্রন্থের সম্পাদক অক্ষয়চন্দ্র সরকারের কাছ থেকে টমাস চ্যাটার্টন নামক জনৈক বালককবির কথা শুনে তিনি কাব্যটি রচনা করেন। উল্লেখ্য, টমাস চ্যাটার্টন প্রাচীন কবিদের অনুকরণে মৈথিলি ভাষায় কবিতা লিখতেন। তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একমাত্র পদাবলি সাহিত্যের রচয়িতা। কাব্যটি উৎসর্গ করেন কাদম্বরী দেবীকে।

 

‘সোনার তরী' (১৮৯৪): এ কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতা পদ্মাবিধৌত পূর্ববঙ্গের পটভূমিতে লেখা, যা তিনি শিলাইদহে বসে রচনা করেন। এ কাব্যে কবি তার জীবন ও কীর্তির ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্বের কথা বলেছেন। বিখ্যাত কবিতা ‘সোনার তরী' যা মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত। এ কাব্যের অন্যান্য কবিতা ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’, ‘হিং টিং ছট'।

 

'চিত্রা' (১৮৯৬): এ কাব্যের কিছু কবিতায় বাস্তবমুখিতা, কিছু কবিতায় নিরুদ্দেশ সৌন্দর্যের অভিসার- এই দুই ভিন্নমুখী সুর এ কাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। উল্লেখযোগ্য কবিতা: উর্বশী, জীবনদেবতা, ১৪০০ সাল, বিজয়িনী, দুই বিঘা জমি, দুঃসময়, স্বর্গ হইতে বিদায় ইত্যাদি।

 

 

‘কথা ও কাহিনী' (১৯০০): ‘কথা' (১৮৯৯) ও ‘কাহিনী’ (১৮৯৯) নামে পৃথক দুটি কাব্যের একত্রিত রূপ এ কাব্যটি। কাব্যটির অধিকাংশ কবিতার উৎস উইলিয়াম টডের ‘রাজস্থান' গ্রন্থের কাহিনি। কবিতা: দেবতার গ্রাস, বিসর্জন, গান্ধারীর আবেদন, পূজারিণী ইত্যাদি।

 

ক্ষণিকা' (১৯০০): জীবনের আপাত-তুচ্ছ মুহূর্তগুলির প্রতি গভীর ভালোবাসা, যৌবনের উল্লাস ও চটুলতা এ কাব্যের মূল সুর । উল্লেখযোগ্য কবিতা: ক্ষণিকা, অচেনা, উদাসীন। ‘স্মরণ' (১৯০৩): স্ত্রীর মৃত্যুকে উপলক্ষ করে রবীন্দ্রনাথ এটি রচনা করেন। ১৯০২ সালে (৭ অগ্রহায়ণ, ১৩০৯ বঙ্গাব্দ) রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবী মৃত্যুবরণ করেন ।

 

খেয়া’ (১৯০৬): এ কাব্যের ৫৫টি কবিতার মধ্যে ক্লান্তি ও বিষাদের সুর প্রাধান্য পেয়েছে। উল্লেখযোগ্য কবিতা: পথের শেষ, বিদায়, আগমন, জাগরণ, শেষ খেয়া, দীঘি। এটি জগদীশচন্দ্র বসুকে উৎসর্গ করেন।

 

বলাকা' (১৯১৬): ফরাসী দার্শনিক বার্গস-র তত্ত্ব প্রয়োগ করে তিনি এ কাব্যটি রচনা করেন। এ কাব্যে গতিতত্ত্বের প্রকাশ ঘটেছে। এ কাব্যে মোট ৪৫টি কবিতা রয়েছে। বিখ্যাত কবিতা ‘সবুজের অভিযান’, ‘শা-জাহান’, ‘ছবি’, শঙ্খ' । এটি তিনি উইলিয়াম পিয়ারসনকে উৎসর্গ করেন ।

 

পলাতকা’ (১৯১৮) : রবীন্দ্রনাথ তাঁর জ্যেষ্ঠকন্যা মাধুরীলতার অকাল মৃত্যুর (মে, ১৯১৮) চালচিত্র ধারণ করে রচনা করেন এ কাব্যটি। এ কাব্যে নারীজীবনের সমসাময়িক সমস্যাগুলি আলোচিত হয়েছে।

 

পূরবী' (১৯২৫): এটি আর্জেন্টিনার কবি ভিক্টোরিয়া ওকাম্পকে উৎসর্গ করেন এবং ভিক্টোরিয়া ওকাম্পকে ‘বিজয়া” নামে অভিহিত করেন।

 

পুনশ্চ' (১৯৩২): এ কাব্য থেকে তিনি গদ্যরীতিতে কবিতা লেখা শুরু করেন। উল্লেখযোগ্য কবিতা: ক্যামেলিয়া, সাধারণ মেয়ে, বাঁশি। শেষ চিঠি,

 

‘আকাশ প্রদীপ' (১৯৩৯): এ কাব্যের কবিতায় কবির শৈশবস্মৃতি এবং জীবন সায়াহ্নের অনুভূতির প্রকাশ পেয়েছে। এটি উৎসর্গ করেন সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে।

 

‘শেষলেখা' (১৯৪১): এটি তাঁর শেষ কাব্যগ্রন্থ যা মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়।

 

'স্ফুলিঙ্গ' (১৯৪৫): কবি জীবিতাবস্থায় অনেক ব্যক্তির ডায়রিতে কয়েকটি লাইন লিখে স্বাক্ষর দিয়েছেন। এই কয়েকটি লাইনই ছিল এক একটি কবিতা। পরবর্তীতে ‘স্ফুলিঙ্গ' গ্রন্থটিতে এসব কবিতা সংকলন করা হয় ।

 

‘সন্ধ্যা-সংগীত' (১৮৮২),

'মানসী' (১৮৯০),

চৈতালি’ (১৮৯৭),

কণিকা' (১৮৯৯),

'কল্পনা' (১৯০০),

'নৈবেদ্য' (১৯০১),

উৎসর্গ' (১৯১৪),

মহুয়া' (১৯২৯),

পরিশেষ’(১৯৩২),

শেষসপ্তক' (১৯৩৫),

শ্যামলী' (১৯৩৬),

পত্রপুট' (১৯৩৬),

সেঁজুতি' (১৯৩৮),

রোগশয্যায়' (১৯৪০),

নবজাতক' (১৯৪০),

'আরোগ্য' (১৯৪১),

জন্মদিনে' (১৯৪১)।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যগ্রন্থ মনে রাখার কেীশল:

কবি কাহিনীতে আছে বিশ্বকবি চৈতালীতে মানসী সোনার তরী দিয়ে খেয়া পার হন।তারপর কবি কাহিনীতে শোনা যায় সেজুতির বনফুল নিয়ে কবি শ্যামলী মহুয়াকে দিয়ে নবজাতকের জন্মদিনে সানাই বাজিয়ে প্রভাত সঙ্গীত সঞ্চয়িতা উৎসর্গ করেন। তারপর আকাশে প্রদীপ জ্বালিয়ে পুরবী,বলাকা,কড়ি ও কোমল পত্রপুট পাঠ করেন।ক্ষণিকার কণিকার কল্পনার স্ফুলিঙ্গ পুনশ্চ কাব্যে আরোগ্য লাভ করেন। ছড়ার ছবি গীতাঞ্জলী কাব্যে ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী ব্রজবুলিতে শেষ লেখা লেখেন।

“মানসী” কাব্যগ্রন্থ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিণত কাব্যকলার অন্যতম প্রতিফলন ‘মানসী' (১৮৯০)। এ কাব্যে বিশাল প্রকৃতির প্রভাব কবির আবেগ-অনুভূতি, চিন্তা-চেতনায়, মেধা-মননে ব্যাপকভাবে ক্রিয়াশীল। কবি নিজেই বলেছেন, ‘নূতন আবেষ্টনে এই কবিতাগুলি সহসা যেন নবদেহ ধারণ করল।’ ‘মানসী’ কাব্যে কবির সঙ্গে যেন একজন শিল্পী এসে যোগ দিল। এ কাব্যের কবিতায় একদিকে যেমন রয়েছে অতীত জীবনের পিছুটান আবার অপরদিকে রয়েছে নবযৌবনের কর্ম- উদ্দীপনার প্রখর দীপ্তি। তাই বুদ্ধদেব বসু ‘মানসী' কাব্যকে রবীন্দ্র-কাব্যের অণুবিশ্ব বলেছেন। এ কাব্যের উল্লেখযোগ্য কবিতা: ‘নিষ্ফল কামনা’ ‘দুরন্ত আশা’  কুলুধ্বনি’‘মেঘদূত’, ‘অহল্যার প্রতি’, ‘আত্মসমর্পণ' ইত্যাদি।

‘‘গীতাঞ্জলি”  কাব্যগ্রন্থ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৭টি গানের সংকলন ‘গীতাঞ্জলি’ (১৯১০) কাব্য। এ কাব্যের গানগুলি ১৯০৮-১৯০৯ সালের মধ্যে রচিত এবং গ্রন্থাকারে ১৯১০ সালে প্রকাশিত। এ গানগুলো মূলত কবিতা এবং সহজ ও সরল ভাষায়, সাবলীল ছন্দে রচিত। এ গান জাতীয় কবিতাগুলোতে ফুটে উঠেছে ঈশ্বরকে না পাওয়ার বেদনা, আত্ম-অহংকার বিসর্জন দিয়ে সহনশীলতা প্রদর্শন, ঈশ্বরের ক্ষণদর্শনানুভূতি, দীন-হীনদের মাঝে ঈশ্বর কল্পনা, অসীম-সসীমের লীলাতত্ত্ব ইত্যাদি। এর মূলসুর ঈশ্বরকেন্দ্রিক হলেও তা কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য নয়। এটি বিশাল প্রকৃতির সৌন্দর্য থেকে উৎসারিত অধ্যাত্মবোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। গীতাঞ্জলির ১৫৭টি গানের মধ্য থেকে ৫৩টি, ‘গীতিমাল্য' ১৬টি, ‘নৈবেদ্য’ ১৫টি, ‘খেয়া’ ১১টি, ‘শিশু’ ৩টি, ‘কল্পনা’ ১টি, ‘উৎসর্গ’ ১টি, ‘স্মরণ’ ১টি, ‘চৈতালী’ ১টি এবং ‘অচলায়তন’ থেকে ১টিসহ মোট ৯টি গ্রন্থের ১০৩টি গান/কবিতার ইংরেজি অনুবাদ Song Offerings নামে নভেম্বর, ১৯১২ সালে ইন্ডিয়া সোসাইটি থেকে প্রকাশিত হয়। Song Offerings এর ভূমিকা লিখেন ইংরেজ কবি WB Yeats. ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের কিছু গানের ইংরেজি অনুবাদ করে দেন ব্রিটিশ লেখক ও অনুবাদক ব্রাদার জেমস ও জো উইন্টার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ Song Offerings এর জন্য নোবেল পান ।

‘‘শেষলেখা” কাব্যগ্রন্থ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সর্বশেষ কাব্য ‘শেষলেখা' (১৯৪১)। এটি তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়, তাই তিনি এটির নামকরণ করে যেতে পারেননি। এ গ্রন্থের কবিতাগুলো তাঁর জীবনের শেষ সময়কালের লেখা এবং কয়েকটি কবিতা মুখে মুখে রচিত। ‘তোমার সৃষ্টির পথ', ‘দুখের আঁধার রাত্রি' প্রভৃতি কবিতায় রয়েছে জীবন সম্বন্ধে দার্শনিক গভীর অনুভূতির প্রকাশ অপরদিকে, অন্যান্য কবিতায় ভাববাদী দর্শনের মধ্যেও ইহজগৎ প্রীতি গভীরভাবে প্রকাশিত। যেমন-

‘রূপনারানের কূলে / জেগে উঠিলাম;

জানিলাম এ জগৎ / স্বপ্ন নয়'।

উপন্যাস

রবীন্দ্রনাথের মোট উপন্যাস ১২টি।

 

করুণা’: এটি তাঁর প্রথম লেখা অসমাপ্ত উপন্যাস। এটি মাসিক ‘ভারতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক প্রকাশিত ‘রবীন্দ্র রচনাবলি'তে (১৯৬১) প্রথম ‘করুণা' প্রকাশিত হয়। ২৭টি পরিচ্ছেদে এ উপন্যাসটি রচিত। উল্লেখযোগ্য চরিত্র: মহেন্দ্র, মোহিনী, রজনী। অনেকের মতে, এটি রবীন্দ্রনাথের প্রথম উপন্যাস। যেহেতু এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি, সুতরাং এটি প্রথম উপন্যাস- এ দাবিটি হাস্যকর ও অযৌক্তিক।

 

রাজর্ষি' (১৮৮৭): ত্রিপুরার রাজপরিবারের ইতিহাস নিয়ে লেখা ঐতিহাসিক উপন্যাস। উপন্যাসটি ‘বালক' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। এ উপন্যাসের প্রথমাংশ নিয়ে ‘বিসর্জন' (১৮৯০) নাটক রচিত হয়।

 

নৌকাডুবি' (১৯০৬): এটি সামাজিক উপন্যাস, যা 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

 

‘প্রজাপতির নির্বন্ধ' (১৯০৮): এটি হাস্যরসাত্মক উপন্যাস। পরবর্তীতে এর নাট্যরূপ প্রহসন ‘চিরকুমার সভা' ।

 

‘ঘরে-বাইরে' (১৯১৬): চলিত ভাষায় রচিত রবীন্দ্রনাথের প্রথম উপন্যাস, যা ‘সবুজপত্র' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। স্বদেশী আন্দোলনের পটভূমিতে ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এর মূল সুর। এ উপন্যাসের নায়িকা বিমলা স্বামী নিখিলেশের প্রতি অনুরাগ থাকা সত্ত্বেও বিপ্লবী সন্দীপের দ্বারা আকর্ষিত। একদিকে বাইরের আন্দোলনের উত্তেজনা অন্যদিকে তিনটি মানুষের জীবনে টানাপোড়েন ও ব্যক্তিগত জীবনের দ্বন্দ্ব, এই দুই মিলে ‘ঘরে-বাইরে' উপন্যাস। উল্লেখযোগ্য চরিত্র: নিখিলেশ (রাজবংশীয় যুবক অতিমাত্রায় শুদ্ধাচারী), বিমলা (সাধারণ পরিবারের মেয়ে), সন্দীপ (স্বদেশী আন্দোলনের নেতা) ।

 

চতুরঙ্গ' (১৯১৬): সাধু ভাষায় রচিত রবীন্দ্রনাথের সর্বশেষ উপন্যাস ।

 

যোগাযোগ” (১৯২৯): সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস। মাসিক ‘বিচিত্রা' পত্রিকায় প্রকাশকালে এর নাম ছিল “তিন পুরুষ'। পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশের সময় এর নামকরণ হয় ‘যোগাযোগ”। নায়িকা কুমুদিনী ও নায়ক মধুসূদনের ব্যক্তিত্বের তীব্র বিরোধ এ উপন্যাসের কেন্দ্র। শেষে স্বামীর কাছে কুমুদিনীর দ্বিধান্বিত সমর্পণ। চরিত্র: মধুসূদন, কুমুদিনী ।

 

দুইবোন' (১৯৩৩): উপন্যাসটি ১৯৩২-১৯৩৩ সাল পর্যন্ত 'বিচিত্রা' পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়। বড় বোন শর্মিলার স্বামী শশাঙ্কের সাথে ছোট বোন ঊর্মিলার ঘনিষ্ঠতা তাদের জীবনে যে আলোড়ন তুলেছিল, তারই নাটকীয়তার রূপায়ণ এ উপন্যাস। চরিত্র: শর্মিলা, ঊর্মিলা, শশাঙ্ক ।

 

‘চার অধ্যায়' (১৯৩৪) : অসহযোগ আন্দোলন পরবর্তীতে বাংলায় নতুন করে যে হিংসাত্মক বিপ্লব প্রচেষ্টা গড়ে উঠেছিল, তাঁর প্রতি বিরূপ মনোভাব ফুটে উঠেছে এ উপন্যাসে। সন্ত্রাসবাদের সমালোচনা করে এ উপন্যাসের কাহিনি রচিত। চরিত্র: অতিন, এলা, ইন্দ্ৰনাথ ।

 

'মালঞ্চ' (১৯৩৪): মৃত্যুপথযাত্রী নারী নীরজা ও তাঁর স্বামী আদিত্যকে কেন্দ্র করে এ উপন্যাসের কাহিনি রচিত। উল্লেখযোগ্য চরিত্র: নীরজা, আদিত্য, সরলা।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যগ্রন্থ মনে রাখার কেীশল:

বিশ্বকবির চোখের বালি রাজর্ষি চতুরঙ্গকে তার দুই বোনের সাথে ঘরে বাইরে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।তাই প্রখ্যাত রাজনৈতিক গোরা বৌ ঠাকুরানীর হাটে যাওয়ার সময় নেীকাডুবিতে যারা প্রাণ দেন তাদের শেষের কবিতা নামক চার অধ্যায়ের উপন্যাস রচনা করার জন্য মালঞ্চকে নির্দেশ দেন।

‘বৌঠাকুরানীর হাট’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ঐতিহাসিক উপন্যাস 'বৌঠাকুরানীর হাট' (১৮৮৩)। এ উপন্যাসের কাহিনি রবীন্দ্রনাথ প্রতাপচন্দ্র ঘোষের 'বঙ্গাধিপতি পরাজয়' (১৯৬৯) থেকে সংগ্রহ করেন। বাল্যকালে রবীন্দ্রনাথ মাতৃবিয়োগের পর বড় বোন সৌদামিনী দেবীর স্নেহে লালিত-পালিত হন। এ সময়কাল সম্পর্কিত কিছু কাহিনি এবং কয়েকটি ঐতিহাসিক চরিত্রের সম্মিলনে তিনি এটি রচনা করেন। যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য ও বাকলার জমিদার রামচন্দ্রের বিবাদকে উপজীব্য করে রচনা করেন। উপন্যাসের প্রধান চরিত্রগুলোর মধ্যে ঐতিহাসিকতার ছোঁয়া থাকলেও এসবের সঙ্গে ইতিহাসের সরাসরি কোন সম্পর্ক নাই। চরিত্র: বসন্ত রায়, উদয়াদিত্য, রামচন্দ্র। পরবর্তীতে তিনি এর কাহিনি অবলম্বনে 'প্রায়শ্চিত্ত' (১৯০৯) নাটকটি রচনা করেন।

'চোখের বালি'

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস 'চোখের বালি' (১৯০৩)। এটি ৫৫টি পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত। এ উপন্যাসটি প্রথমে 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। সমাজ ও যুগযুগান্তরের সংস্কারের সাথে ব্যক্তিজীবনের বিরোধ এ উপন্যাসের মূল সুর। বিনোদিনীর সাথে মহেন্দ্রের বিয়ে হওয়ার কথা থাকলেও মহেন্দ্রের অনাগ্রহের কারণে অন্যত্র বিয়ে হয় এবং কিছু দিনের মধ্যে বিধবা হয় । শিক্ষিত, মার্জিত বিনোদিনী ঘটনাচক্রে মহেন্দ্রের বাড়িতে আসলে তাকে দেখে মহেন্দ্ৰ মুগ্ধ হয় এবং উপলব্ধি করে সমচেতনা সম্পন্ন জীবনসঙ্গীর প্রয়োজনীয়তা। সুন্দরী ও কর্মদক্ষ বিনোদিনী তিলে তিলে মহেন্দ্রকে ঘোরায় চড়কির মত। কিন্তু বিনোদিনী সমর্পিত হতে চায় বিহারীর নিকট। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বিনোদিনীকে জীবনের সকল কোলাহল এড়িয়ে কাশীর নির্লিপ্ত জীবনে নিক্ষেপ করেন। চরিত্র: আশালতা,মহেন্দ্র, বিনোদিনী, বিহারী, রাজলক্ষ্মী, অন্নপূর্ণা।

‘গোরা'

উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগের ধর্মান্দোলন, স্বদেশপ্রেম ও নারীমুক্তি চিন্তার পটভূমিকা তুলে ধরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেন বিখ্যাত রাজনৈতিক উপন্যাস 'গোরা' (১৯১০)। এটি ১৯০৮-১৯১০ পর্যন্ত 'প্রবাসী' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসের নায়ক গোরা সিপাহী বিপ্লবের সময় নিহত আইরিশ দম্পতির সন্তান। পরে সে লালিত- পালিত হয় হিন্দু ব্রাহ্মণ কৃষ্ণদয়াল ও আনন্দময়ীর কাছে। গোরা আস্তে আস্তে হিন্দু ধর্মের অন্ধ সমর্থক হয়ে উঠে। সময়ের নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে এক নারীর ভালোবাসা কিভাবে তাকে অন্ধতা ও সংকীর্ণতা থেকে নির্দিষ্ট ধর্মকে অতিক্রম করে মানবতাবাদী আদর্শিক মহাভারতবর্ষের দিকে পৌঁছে, তারই কাহিনি 'গোরা' উপন্যাস। এ উপন্যাসে ব্যক্তির সাথে সমাজের, সমাজের সাথে ধর্মের এবং ধর্মের সাথে সত্যের বিরোধ ও সমন্বয় চিত্রিত হয়েছে।

'শেষের কবিতা'

রবীন্দ্রনাথের কাব্যধর্মী উপন্যাস 'শেষের কবিতা' (১৯২৯)। এটি ১৯২৮ সালে 'প্রবাসী' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। ভাষার অসামান্য কবিত্ব, দৃপ্তশক্তি ও পাণ্ডিত্যের দীপ্তি এ উপন্যাসটিকে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে যা রবীন্দ্রনাথের বিস্ময়কর সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠ। সুকুমার সেন এ উপন্যাস সম্পর্কে বলেছেন, 'বৈষ্ণব সাধনায় পরকীয়াতত্ত্ব রবীন্দ্রনাথের কবিমানসে যেভাবে রূপান্তর লাভ করিয়াছিল শেষের কবিতায় তার পরিচয় পাই'। অমিত ও লাবণ্যের প্রণয়কাহিনি সাহিত্যিক ব্যঞ্জনায় অমর হয়ে উঠেছে এবং বিচিত্রতা দান করেছে। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র অমিত রায় ব্যারিস্টারি পড়তে বিলেত গিয়েছি। তার ছেলে বন্ধুর চেয়ে মেয়ে বন্ধু বেশি। এদের মধ্যে কেতকীর সাথে অমিতের প্রেম হয় এবং অমিতের দেয়া আংটিও পরে। ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফিরে অমিত শিলংয়ে বেড়াতে গেলে উপন্যাসের মূল নায়িকা লাবণ্যের সাথে পরিচয় থেকে প্রেম হয়। কিন্তু লাবণ্য বুঝতে পারে অমিত রোমান্টিক জগতের স্বপ্নাতুর ব্যক্তি। তবুও তাদের বিয়ে ঠিক হলে উপস্থিত হয় কেতকী। ভেঙ্গে যায় বিয়ে। কেতকীর সাথে অমিতের বিয়ে উপন্যাসকে ভিন্নতর রূপ দান করেছে। লাবণ্য বিয়ে করে শোভনলালকে । উপন্যাসের কিছু বাক্য আজ প্রবাদের মর্যাদা পেয়েছে। যেমন- ফ্যাশনটা হলো মুখোশ, স্টাইলটা হলো মুখশ্রী। ‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও' কবিতার মাধ্যমে উপন্যাসের পরিসমাপ্তি ঘটে। এ উপন্যাসে ভাষাবিদ ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখ আছে ।

নাটক

রবীন্দ্রনাথের প্রধান নাটকগুলোর নাম :

রবীন্দ্রনাথের মোট নাটক ২৯টি, কাব্যনাট্য ১৯টি।

 

রূপক ও সাংকেতিক নাটক:

 

ডাকঘর' (১৯১১): এ নাটকের নায়ক অমল ঘরের মধ্যে বন্দী এক রুগ্ন বালক। তার ধারণা, সে একদিন বাইরে যাবে এবং তার নামে রাজার চিঠি আসবে। বিষয়ী লোকেরা তাকে উপহাস করত। কিন্তু একদিন সত্যি সত্যি রাজা এলেন। চরিত্র: অমল ।

 

‘কালের যাত্রা' (১৯৩২): এটি শরৎচন্দ্রকে উৎসর্গ করেন।

 

“তাসের দেশ” (১৯৩৩): রাজপুত্র ও সদাগর পুত্র এক অপরিচিত দ্বীপে এসে পৌঁছেছেন, যে দ্বীপের জীবন শাসিত হয় যান্ত্রিক নিয়মানুবর্তিতায়, যুক্তি ও হৃদয়হীন শাসনতন্ত্রের আনুগত্যে। রাজপুত্র ও সদাগরপুত্র স্বাধীনভাবে বসবাসের জন্য করলেন বিদ্রোহ, এটাই এ নাটকের মূল বিষয়। এটি রবীন্দ্রনাথ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে উৎসর্গ করেন। 

‘প্রকৃতির প্রতিশোধ' (১৮৮৪), 'রাজা ও রাণী' (১৮৮৯), ‘রাজা’ (১৯১০), ‘অচলায়তন' (১৯১২), ‘রক্তকরবী' (১৯২৬)।

 

নৃত্যনাট্য: 

এ নাটকের মূল বৈশিষ্ট্য হলো গীতিনির্ভর নাট্যধর্মী নৃত্য । বিভিন্ন কাহিনি অবলম্বনে নৃত্য নির্মিত হয়।

 

চিত্রাঙ্গদা' (১৮৯২): মনিপুর রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা ও অর্জুনের পৌরাণিক প্রণয় কাহিনি অবলম্বনে রচিত এ নাটক। এটি অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত।

 

‘নটীর পূজা' (১৯২৬): রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘কথা ও কাহিনী'র অন্তর্গত পূজারিণী কবিতাটির আখ্যান অবলম্বনে এ নাটকটি রচনা করেন। এ নাটকে প্রথম অভিনয়ের সাথে নাচ ও গানের প্রয়োগ ঘটে ।

 

চণ্ডালিকা’ (১৯৩৩): ‘প্রকৃতি' একজন চণ্ডালী কন্যা। সে কিভাবে তার মায়ের সাহায্যে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে প্রলোভিত করেছিল, সেই কাহিনিই এর মূল বিষয়। অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ যেমন এর প্রধান সুর তেমনি আছে সংরাগের প্রকাশ ও সংযমের সুষমা।

 

শ্যামা' (১৯৩৯)।

 

কাব্যনাট্য:

‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’ (১৮৮৪),

‘মায়ার খেলা' (১৮৮৪),

‘বিদায় অভিশাপ' (১৮৯৪)।

গীতিনাট্য:

বসন্ত' (১৯২৩): এ গীতিনাট্যটি কাজী নজরুল ইসলামকে উৎসর্গ করেন। অনেকেই এ উৎসর্গের বিষয়টি সহজে মেনে নিতে পারেনি। এর প্রত্যুত্তরে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- ‘নজরুল ইসলাম সম্পর্কে তোমাদের মনে যেন কিছু সন্দেহ রয়েছে। নজরুলকে আমি ‘বসন্ত' গীতিনাট্য উৎসর্গ করেছি এবং উৎসর্গপত্রে তাকে 'কবি' বলে অভিহিত করেছি। জানি তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এটা অনুমোদন করতে পারোনি। আমার বিশ্বাস, তোমরা নজরুলের কবিতা না পড়েই এই মনোভাব পোষণ করেছো। সমগ্র জাতির অন্তর যখন সে সুরে বাঁধা, অসির ঝনঝনায় যখন সেখানে ঝংকার তোলে, ঐকতান সৃষ্টি হয়, তখন কাব্যে তাকে প্রকাশ করবে বৈকি! আমি যদি আজ তরুণ হতাম, তাহলে আমার কলমেও ঐ সুর বাজতো।'

কালমৃগয়া’ (১৮৮২)।

অন্যান্য নাটক: ‘শারদোৎসব' (১৯০৮), ‘প্রায়শ্চিত্ত’ (১৯০৯), ‘মুক্তধারা' (১৯২২)।

প্রহসন:

‘বৈকুণ্ঠের খাতা' (১৮৯৭): এক আত্মভোলা সরল প্রকৃতির বৃদ্ধকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নানা কৌতুকময় ঘটনা, যা এ প্রহসনের মূল বিষয়। এটি কৌতুক প্রকৃতির প্রহসন ।

‘চিরকুমার সভা” (১৯২৬): রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০০-১৯০১ সাল পর্যন্ত ‘বঙ্গদর্শন' পত্রিকায় ‘প্রজাপতির নির্বন্ধ' নামে একটি আখ্যান রচনা করেন। পরবর্তীতে এটি ১৯০৮ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ১৯২৬ সালে ‘প্রজাপতি র নির্বন্ধ'কে ‘চিরকুমার সভা' নামে নাট্যরূপ দেন। একদল যুবকের বিয়ে না করার প্রতিজ্ঞা এবং পরে প্রতিজ্ঞাভঙ্গের কৌতুককর কাহিনি নিয়ে এ প্রহসন রচিত ।

‘গোড়ায় গলদ' (১৮৯২), ‘হাস্যকৌতুক' (১৯০৭), ‘শেষ রক্ষা'।

‘বিসর্জন' নাটক

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মঞ্চসফল ও জনপ্রিয় নাটকের মধ্যে অন্যতম ‘বিসর্জন' (১৮৯০)। এটি অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত নাটক। এ নাটকে শুধু আত্মবিসর্জনে সমস্যার সমাধান খোঁজা হয়নি, তার চেয়েও কঠোর ত্যাগের মধ্য দিয়ে বিরোধের অবসান প্রদর্শিত হয়েছে। উদার ধর্মবোধ এবং সংকীর্ণ ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে দ্বন্দ্ব যেমন এ নাটকের প্রধান উপকরণ, তেমনি বিশ্বাসের উগ্রতা এবং মানব সম্পর্কের নিবিড়তা এ নাটকের প্রধান বৈশিষ্ট্য। রবীন্দ্রনাথ নিজে এ নাটকের রঘুপতি ও জয়সিংহের ভূমিকায় অভিনয় করেন। অন্যান্য চরিত্র: অপর্ণা, গুণবতী, গোবিন্দ্যমাণিক্য।

‘‘রক্তকরবী' নাটক

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাংকেতিক নাটক ‘রক্তকরবী' (১৯২৬)। মানুষের প্রবল লোভ কিভাবে জীবনের সমস্ত সৌন্দর্য ও স্বাভাবিকতাকে অস্বীকার করে মানুষকে নিছক উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত করে এবং এর বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদ কি রূপ ধারণ করে, তারই রূপায়ণ ‘রক্তকরবী' নাটক। এ নাটকে ধনের উপর ধান্যের, শক্তির উপর প্রেমের এবং মৃত্যুর উপর জীবনের জয়গান গাওয়া হয়েছে।

ছোটগল্প

বাংলা ছোটগল্পের জনক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।রবীন্দ্রনাথের মোট ছোটগল্প ১১৯টি।

 

প্রেম সম্পর্কিত গল্প :

‘শেষকথা’, ‘মধ্যবর্তিনী’, ‘সমাপ্তি’ (নায়িকা- মৃন্ময়ী), ‘নষ্টনীড়' (প্রধান চরিত্র- চারু), ‘একরাত্রি' (নায়িকা- সুরবালা)।

 

সমাজ সম্পর্কিত গল্প :

ছুটি’ (প্রধান চরিত্র- ফটিক), ‘হৈমন্তী' (প্রধান চরিত্র- হৈমন্তী, অপু, গৌরীশঙ্কর । যৌতুক প্রথার প্রাধান্য), ‘পোস্ট- মাস্টার' (প্রধান চরিত্র- রতন), ‘দেনাপাওনা' (বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ছোটগল্প), ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন' (প্রধান চরিত্র- রাইচরণ), ‘কাবুলিওয়ালা’ (প্রধান চরিত্র- রহমত, খুকি। মুসলমান চরিত্র সংযুক্ত), “শাস্তি” (চরিত্র- চন্দরা), ‘দুরাশা', ‘মাস্টার মশাই”

 

অতিপ্রাকৃত গল্প :

‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘কঙ্কাল’, ‘নিশীথে’, ‘জীবিত ও মৃত (প্রধান চরিত্র- কাদম্বিনী) ।

রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পগুলোর বৈশিষ্ট্য

রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পগুলোর বৈশিষ্ট্য :

বাংলা ছোটগল্পের সার্থক রূপকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আনন্দময় বৈচিত্র্যে ভরা ছোটগল্প সৃষ্টি তাকে বিখ্যাত সাহিত্যিক হিসেবে বিশ্বজনীন খ্যাতি ও স্বীকৃতি প্রদান করেছে। বাংলার নির্জন প্রান্তর, নদীর তীর, উন্মুক্ত আকাশ, বালুচর, অবারিত মাঠ, ছায়া-সুনিবিড় গ্রামে সহজ-সরল  অনাড়ম্বর জীবন, অভাবক্লিষ্ট অথচ শান্ত, সহিষ্ণু গ্রামবাসী ইত্যাদি বিষয় রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি ‘সোনার তরী' কাব্যের ‘বর্ষাযাপন' কবিতায় ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন।

ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা,   ছোট ছোট দুঃখ কথা

               নিতান্তই সহজ সরল,

সহস্র বিস্মৃতি রাশি      প্রত্যহ যেতেছে ভাসি

              তারি দু-চারিটি অশ্রুজল ।

নাহি বর্ণনার ছটা,        ঘটনার ঘনঘটা

              নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ

অন্তরে অতৃপ্তি রবে     সাঙ্গ করি মনে হবে

         শেষ হয়েও হইল না শেষ।

প্রবন্ধ গ্রন্থ

রবীন্দ্রনাথের প্রধান প্রবন্ধ গ্রন্থগুলোর নাম:

কালান্তর' (১৯৩৭): এটি ভারতবর্ষীয় রাজনৈতিক সমস্যা বিষয়ক বিভিন্ন প্রবন্ধের সংকলন ।

পঞ্চভূত' (১৮৯৭): এ প্রবন্ধগুলি 'সাধনা' পত্রিকায় ‘পঞ্চভূতের ডায়রি’ নামে প্রকাশিত হতো। পত্রিকায় প্রকাশের সময় লেখকের নাম ছাপা হতো ‘লেখক ভূতনাথ বাবু' ।

‘বিবিধ প্রসঙ্গ' (১৮৮৩), ‘বিচিত্র প্রবন্ধ' (১৯০৭), ‘সাহিত্য’ (১৯০৭), ‘শিক্ষা’ (১৯০৮), ‘মানুষের ধর্ম' (১৯৩৩), ‘সভ্যতার সংকট’ (১৯৪১)।

‘সভ্যতার সংকট’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সর্বশেষ গদ্যরচনা ‘সভ্যতার সংকট’ (১৯৪১)। এ ক্ষুদ্র কিন্তু অসামান্য প্রবন্ধে ইউরোপীয় সভ্যতা ও ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের তীব্র সমালোচনা ও মানবতার প্রতি গভীর আস্থা প্রকাশিত। ‘মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ' উক্তিটি তিনি এ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

ভ্রমণকাহিনি

রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণকাহিনি সমূহ:

‘য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র (১৮৮১): এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত ভ্রমণকাহিনি । এটি চলিত ভাষায় লিখিত ।

‘য়ুরোপ প্রবাসীর ডায়রি’ (১৮৯১), ‘জাভা যাত্রীর পত্র' (১৯২৯), ‘জাপান যাত্রী' (১৯১৯), ‘রাশিয়ার চিঠি (১৯৩১), ‘পারস্যে' (১৯৩৬)।

ধ্বনিবিজ্ঞানের উপর লেখা গ্রন্থ

রবীন্দ্রনাথের ধ্বনিবিজ্ঞানের উপর লেখা গ্রন্থের নাম  ‘শব্দতত্ত্ব' (১৯০৯)।

বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ

রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থের নাম ‘বিশ্বপরিচয়' (১৯৩৭)।

পত্র সংকলন

রবীন্দ্রনাথের পত্র সংকলনগুলোর নাম:

 

ছিন্নপত্র' (১৯১২): এতে মোট ১৫৩টি পত্র আছে। এর প্রথম ৮টি পত্র শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে এবং ১৪৫টি পত্র ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে লেখা ।

 

‘ভানুসিংহের পত্রাবলী’: এটি রানু অধিকারীকে লেখেন।

 

‘পথে ও পথের প্রান্তে’: নির্মলকুমারী মহলানবিশকে লেখা ।

চিত্রকলার সংখ্যা

৭০ বছর বয়সের পর তিনি ছবি আঁকা শুরু করেন। তার অঙ্কিত ছবি ও স্কেচের সংখ্যা প্রায় ২০০০। নিজের আঁকা ছবিগুলোকে তিনি 'শেষ বয়সের প্রিয়া' বলে আখ্যায়িত করেছেন।

আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ

রবীন্দ্রনাথের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের নাম:  

জীবনস্মৃতি' (১৯১২): এতে রবীন্দ্রনাথের বাল্যকাল থেকে পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত কালের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। ‘চরিত্রপূজা' (১৯০৭), ‘ছেলেবেলা' (১৯৪০)।

সনেট

রবীন্দ্রনাথের  উল্লেখযোগ্য সনেট “বাংলার মাটি বাংলার জল”

জাতীয় সঙ্গীত

বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি' এটি তাঁর গানের সংকলন 'গীতবিতান' এর স্বরবিতানের স্বদেশ পর্যায়ের অংশভুক্ত। গানটি ১৯০৫ সালে প্রথম ‘বঙ্গদর্শন' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এটি তিনি গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাব তারে' গানের সুরের অনুকরণে রচনা করেন। গানটির প্রথম ১০ লাইন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ৩ মার্চ, ১৯৭১ সালে গ্রহণ করা হয় । কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে এর প্রথম ৪ লাইন বাদ্যযন্ত্র সহযোগে বাজানো হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মোট দুইটি (বাংলাদেশ, ভারত) দেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা এবং শ্রীলংকার জাতীয় সঙ্গীতের সুরকার। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতে বাংলার প্রকৃতির কথা প্রধানভাবে ফুটে উঠেছে।

ভারতের জাতীয় সঙ্গীত : ‘জন গণ মন অধিনায়ক জয় হে, ভারতভাগ্যবিধাতা।'

ঢাকায় আগমন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মোট দুইবার ঢাকায় আসেন। প্রথমবার ১৮৯৮ সালে এবং দ্বিতীয়বার ১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জগন্নাথ হলের তৎকালীন প্রভোস্ট এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বাঙালি উপাচার্য ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকায় আসেন এবং ১০ ফেব্রুয়ারি কার্জন হলে The Meaning of Art শিরোনামে একটি বক্তব্য রাখেন। একই দিনে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্রদের সংবর্ধনায় যোগ দেন। ১৩ ফেব্রুয়ারি কার্জন হলে The Rule of the Giant শিরোনামে দ্বিতীয় বক্তৃতা প্রদান করেন। রবীন্দ্রনাথ জগন্নাথ হলের ছাত্রদের অনুরোধে ‘বাসন্তিকা' নামে একটি গীতিকবিতা রচনা করেন। এ কবিতার প্রথম চার পক্তি নিম্নরূপ:

এই কথাটি মনে রেখো

তোমাদের এই হাসি খেলায়

আমি এ গান গেয়েছিলেম

জীর্ণপাতা ঝরার বেলায় ।

বিখ্যাত পক্তি

১. উদয়ের পথে শুনি কার বাণী

ভয় নাই, ওরে ভয় নাই-

নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান

ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই। (পূরবী)

২. বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা-

বিপদে আমি না যেন করি ভয়। (গীতাঞ্জলি)

৩. এ জগতে হায়, সেই বেশী চায় আছে যার ভুরি ভুরি-

রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি। (দুই বিঘা জমি)

৪. আমি শুনে হাসি, আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোর ঘটে-

তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে ।(দুই বিঘা জমি)

৫. পরে মাস দেড়ে ভিটে মাটি ছেড়ে বাহির হইনু পথে-

করিল ডিক্রি, সকলই বিক্রি মিথ্যা দেনার খতে । (দুই বিঘা জমি)

৬. যে আমারে দেখিবারে পায় অসীম ক্ষমায় ভালো মন্দ মিলায়ে সকলি,

এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি । (শেষের কবিতা)

৭. মানুষ যা চায় ভুল করে চায়, যা পায় তা চায় না।(মানুষের ধর্ম)

৮. যে আছে মাটির কাছাকাছি

সে কবির বাণী-লাগি কান পেতে আছি। (জন্মদিনে)

৯. তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি

তোমার সৃষ্টির পথ- (শেষলেখা)

১০.সন্ধ্যারাগে ঝিলিমিলি ঝিলমের স্রোতখানি বাঁকা। (বলাকা)

১১. আমি যে দেখেছি গোপন হিংসা কপট রাত্রিছায়ে হেনেছে নিঃসহায়ে,

আমি যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে বিচারের

বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে। (প্রশ্ন)

১২. এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাই তুমি করে

গেলে দান ।

১৩. আজ হতে শতবর্ষ পরে, কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি কৌতূহলভরে। (১৪০০ সাল- চিত্রা)

১৪. সম্মুখে শান্তি পারাপার ভাসাও তরী হে কর্ণধার তুমি হবে

চিরসাথী লও লও হে ক্রোড়পতি অসীমের পথে জ্বলিবে

জ্যোতি ধ্রুবতারার । (এটি কবির সমাধিস্তম্ভে লেখা)

১৫. মরণরে, তুঁহু মম শ্যাম সমান! (ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী)

১৬. বাদলা হাওয়ায় মনে পড়ে ছেলে বেলার গান-

বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর্, নদেয় এলো বান্ । (বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর্)

১৭. ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা, ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ,

আধ মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা। (সবুজের অভিযান- বলাকা)

১৮. নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে।

ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে। (আষাঢ়)

১৯. একখানি ছোটো ক্ষেত আমি একেলা। (সোনার তরী )  

২০. এতকাল নদীকূলে যাহা লয়ে ছিনু ভুলে

সকলি দিলাম তুলে ধরে বিথরে-

এখন আমারে লহ করুণা করে। (সোনার তরী)

২১. গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।

কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।

রাশি রাশি ভারা ভারা

ধান কাটা হলো সারা। (সোনার তরী)

২২. ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই- ছোটো সে তরী

আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি। (সোনার তরী)

২৩. খাঁচার পাখি ছিল সোনার খাঁচাটিতে  বনের পাখি ছিল বনে।

একদা কী করিয়া মিলন হল দোঁহে, কী ছিল বিধাতার মনে। (দুই পাখি- সোনার তরী)

২৪. কেরোসিন শিখা বলে মাটির প্রদীপে, ভাই ব'লে ডাক যদি

দেব গলা টিপে।

হেনকালে গগণেতে উঠিলেন চাঁদা- কেরোসিন বলি উঠে,

এসো মোর দাদা! (কুটুম্বিতা বিচার- কণিকা)

২৫.আজি এ প্রভাতে রবির কর কেমনে পশিল প্রাণের পর,

কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাত পাখির গান।

না জানি কেন রে এত দিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ । (নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ)

২৬. নমোঃ নমোঃ নমোঃ সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি!(দুই বিঘা জমি)

২৭. মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই। (প্রাণ)

২৮. হে মোর চিত্ত, পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে। (হে মোর চিত্ত, পুণ্য তীর্থে- গীতাঞ্জলি)

২৯. ও আমার দেশের মাটি, তোমার 'পরে ঠেকাই মাথা। (দেশাত্মবোধক গান)

৩০. বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি, সে আমার নয়। (নৈবেদ্য)

৩১. আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্য সুন্দর (দেশাত্মবোধক গান)

৩২. বুকের রক্ত দিয়া আমাকে যে একদিন দ্বিতীয় সীতাবিসর্জনের কাহিনি লিখিতে হইবে সে কথা কে জানিত। (হৈমন্তী)

৩৩. যাহা দিলাম তাহা উজাড় করিয়াই দিলাম, এখন ফিরিয়া তাকাইতে গেলে দুঃখ পাইতে হইবে। অধিকার ছাড়িয়া দিয়া অধিকার রাখিতে যাইবার মতো এমন বিড়ম্বনা আর নাই। (হৈমন্তী)

৩৪. এ যে দুর্লভ, এ যে মানবী, ইহার রহস্যের কি অন্ত আছে। (হৈমন্তী)

৩৫. সে আমার সম্পত্তি নয়, সে আমার সম্পদ। (হৈমন্তী)

৩৬. হায়রে, তাহার বউমার প্রতি বাবার সেই মধুমাখা পঞ্চস্বর একেবারে এমন বাজখাই নাদে নামিল কেমন করিয়া? (হৈমন্তী)

৩৭. কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই । (জীবিত ও মৃত)

৩৮. একবার নিতান্ত হইল, ‘ফিরিয়া যাই, জগতের ক্রোড়বিচ্যুত সেই অনাথিনীকে সঙ্গে করিয়া লইয়া আসি'... জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া ফল কি? পৃথিবীতে কে কাহার? (পোস্টমাস্টার)

৩৯. শিশুরাজ্যে এই মেয়েটি একটি ছোটখাট বর্গির উপদ্রব বলিলেই হয়। (সমাপ্তি)

৪০. কিন্তু মঙ্গল আলোকে আমার শুভ উৎসব উজ্জ্বল হইয়া উঠিল । (কাবুলিওয়ালা)

৪১. মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। (সভ্যতার সংকট)

৪২. সমগ্র শরীরকে বঞ্চিত করে কেবল মুখে রক্ত জমলে তাকে স্বাস্থ্য বলা যায় না। (রাশিয়ার চিঠি)

৪৩. আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে। (রাজা)

৪৪. যেখানে ফ্রি থিংকিং নেই সেখানে কালচার নেই। (সভ্যতার সংকট)

৪৫. আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না; আড়ম্বর করি, কাজ করি না; যাহা অনুষ্ঠান করি, তাহা বিশ্বাস করি না; যাহা বিশ্বাস করি, তাহা পালন করি না; ভূরি পরিমাণ বাক্যরচনা করিতে পারি, তিল পরিমাণ আত্মত্যাগ করিতে পারি না; আমরা অহংকার দেখাইয়া পরিতৃপ্ত থাকি, যোগ্যতালাভের চেষ্টা করি না। (বিদ্যাসাগরচরিত)

তীর্থযাত্রী

রবীন্দ্রনাথের “তীর্থযাত্রী” কবিতাটি টি এস ইলিয়টের “The Journey Of the Magi”  এর অনুবাদ।

মৃত্যু

তিনি ৭ আগস্ট, ১৯৪১ সালে (বাংলা- ২২ শ্রাবণ, ১৩৪৮) দুপুর ১২টা ১০মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন।

 

এই পোস্টগুলি আপনার ভাল লাগতে পারে:

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন