এসিড , ক্ষার ও লবণ

লেবুর রস, ভিনেগার, চুন, এন্টাসিড ঔষধ, খাবার লবণ এগুলো আমাদের অতি প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী । এদের মধ্যে কোনোটি অম্ল বা এসিড, কোনোটি ক্ষারক আবার কোনোটি হয়তো লবণ। এদের রাসায়নিক ধর্ম ভিন্ন ভিন্ন। ধর্ম অনুযায়ী এদের একেকটি এক এক কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আজকের টিউটরিয়ালে আমরা এসিড , ক্ষার ও লবণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব । সেই সাথে প্রাসঙ্গিক তথ্যগুলো ও উঠে আসবে যেমন - লবণ, ক্ষারক , ক্ষার , লবণ , pH এর ধারণা , বাফার , নির্দেশক , প্রশমন এনথালপি , দৈনন্দিন জীবনে প্রশমন বিক্রিয়ার গুরুত্ব ইত্যাদি ।

এসিড , ক্ষার ও লবণ

এসিড

রাসায়নিক দ্রব্যাদির মধ্যে এসিড খুবই গুরুত্বপূর্ণ । এসিড এক ধরনের রাসায়নিক গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্য যা পানিতে দ্রবীভূত করলে এসিডের অণু বিয়োজিত হয়ে ( ভেঙ্গে ) হাইড্রোজেন আয়ন বা প্রোটর দান করে । অন্য কথায় - যদি কোনো যৌগের অণুতে এক বা একধিক প্রতিস্থাপনীয় হাইড্রোজেন পরমাণু থাকে এবং ঐ প্রতিস্থাপনীয় হাইড্রোজেনকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো ধাতু বা ধাতুর ন্যায় ক্রিয়াশীল কোনো যৌগমূলক দ্বারা আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে প্রতিস্থাপিত করা যায় এবং যা ক্ষারকের সাথে বিক্রিয়া করলে লবণ ও পানি উৎপন্ন করে, তাকে অম্ল বা এসিড বলে ।যেমন- হাইড্রোক্লোরিক এসিড , সালফিউরিক এসিড এরা তীব্র এসিড । এরা পানিতে সম্পূর্ণ (100%) বিয়োজিত হয়। তাই এ ধরনের এসিডকে তীব্র এসিড বা সবল এসিড বলে। অন্যদিকে কার্বনিক এসিড , এসিটিক এসিড এরা পানিতে আংশিক বিয়োজিত হয়। তাই এ ধরনের এসিডকে মৃদু এসিড বা দুর্বল এসিড বলে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, 25°C তাপমাত্রায় 1000টি এসিটিক এসিড অণুর মধ্যে পানিতে মাত্র 4টি অণু বিয়োজিত হয়। বাকি 996টি অণু অবিয়োজিত অবস্থায়ই পানিতে থেকে যায়। এসিড ও পানির দ্রবণে এসিডের পরিমাণ যদি বেশি থাকে তবে তাকে গাঢ় এসিড বলে। আবার, এসিডের জলীয় দ্রবণে পানির পরিমাণ যদি এসিডের তুলনায় অনেক বেশি হয় তবে তাকে লঘু এসিড বলে। এসিড টক স্বাদযুক্ত। তেঁতুলের ভিতরে টারটারিক এসিড থাকে। তাই তেঁতুল এত টক। এসিড দ্রবণ নীল রঙের লিটমাস পেপারকে লাল রঙের লিটমাস পেপারে রূপান্তরিত করে।

আমরা প্রতিদিন অনেক খাবার গ্রহণ করি যেগুলোর মাঝে বিভিন্ন ধরনের এসিড থাকে। যেমন-দুধের মধ্যে ল্যাকটিক এসিড, সফট ড্রিংকসে কার্বনিক এসিড, কমলালেবু বা লেবুতে সাইট্রিক এসিড, তেঁতুলে টারটারিক এসিড, ভিনেগারে ইথানয়িক এসিড, চায়ে ট্যানিক এসিড ইত্যাদি। এই খাদ্যগুলো যখন আমরা খাই তখন খাদ্যের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এসিডগুলো আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। এসিডগুলো আমাদের খাদ্য পরিপাকে সাহায্য করে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ করে। আবার, আচার জাতীয় অনেক এসিডযুক্ত খাদ্য আছে যেগুলো আমাদের খাওয়ার রুচি বৃদ্ধি করে। এসব এসিড খুবই দুর্বল প্রকৃতির হওয়ায় এগুলো আমাদের শরীরের ক্ষতি করে না। আবার, এগুলো খেতে টক স্বাদযুক্ত। আমাদের পাকস্থলীর দেয়াল থেকে হাইড্রোক্লোরিক এসিড উৎপন্ন হয়। এটি অত্যন্ত শক্তিশালী এসিড। এটি পাকস্থলীতে খাদ্যকণা ভাঙতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় পাকস্থলীর দেয়াল থেকে অতিরিক্ত হাইড্রোক্লোরিক এসিড (HCl) নিঃসরিত হয়ে তা পাকস্থলীর দেয়ালের কোষগুলোকে ভাঙতে শুরু করে। আবার, খাদ্য গ্রহণ না করে ক্ষুধার্ত অবস্থায় থাকলে অর্থাৎ পাকস্থলী খালি রাখলে নিঃসরিত হাইড্রোক্লোরিক এসিড (HCI) পাকস্থলীর দেয়ালের কোষগুলোকে ভেঙে সেখানে ক্ষতের সৃষ্টি করে। ফলে পেটে ব্যথা শুরু হয়। এ অবস্থাকে আমরা পেপটিক আলসার বলি। কাজেই যেসব খাদ্য খেলে অতিরিক্ত এসিড নিঃসরিত হয় সেগুলো পরিহার করতে হবে। আবার, বেশি সময় ধরে পেট খালি রাখাও পরিহার করতে হবে।

এসিডের প্রকারভেদ

[ক] শক্তি অনুসারে এসিড দুই প্রকার যথা:
১. তীব্র এসিড/ সবল এসিড
২. মৃদু/ দুর্বল এসিড
১. তীব্র এসিড: যে সমস্ত এসিড পানিতে সম্পূর্ণ রূপে বিয়োজিত হয় প্রচুর পরিমাণে হাইড্রোজেন আয়ন (H+) দেয় তাহাকে তীব্র এসিড বলে । উদাহরণ: নাইট্রিক এসিড , সালফিউরিক এসিড , হাইড্রোক্লোরিক এসিড ইত্যাদি।
২. মৃদু এসিড: যে সমস্ত এসিড পানিতে সামান্য পরিমাণে বিয়োজিত হয়ে হাইড্রোজেন আয়ন উৎপন্ন করে। উদাহরণ: হাইড্রোজেন সায়ানাইড ,কার্বনিক এসিড ইত্যাদি।

[খ] গঠন অনুসারে এসিড দুই প্রকার যথা :
১. হাইড্রাসিড এসিড, ২. অক্সি এসিড
১. হাইড্রাসিড এসিড : যে এসিডের অণুতে হাইড্রোজেন ও অন্য অধাতব মৌল থাকে কিন্তু অক্সিজেন থাকে না তাকে হাইড্রাসিড এসিড। উদাহরন: হাইড্রোক্লোরিক এসিড , হাইড্রোব্রোমিক এসিড , হাইড্রোজেন সায়ানাইড এসিড , হাইড্রোআয়োডিক এসিড ইত্যাদি।
২. অক্সি এসিড: যে এসিডের অণুতে হাইড্রোজেনের সঙ্গে অক্সিজেন ও অন্য এক বা একাধিক অধাতব মৌল থাকে তাকে অক্সি এসিড বলে। উদাহরন: হাইড্রো কার্বনেট এসিড , সালফিউরিক এসিড , ফসফরিক এসিড ইত্যাদি।

[গ] উৎস অনুসারে এসিড দুই প্রকার যথা :
১. অজৈব বা খনিজ এসিড: যে সকল এসিডের অনুতে জৈব কার্বন পরমাণু থাকে না তাদের অজৈব এসিড বলে। অজৈব এসিড বিভিন্ন অজৈব যৌগ হতে প্রস্তুত করা হয়। যেমন - হাইড্রোক্লোরিক এসিড , হাইড্রোব্রোমিক এসিড , সালফিউরিক এসিড , ফসফরিক এসিড ।
২. জৈব এসিড: জৈব অ্যাসিড বা Organic acid হল একটি জৈব যৌগ যাতে অম্লীয় বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে; অর্থাৎ জলীয় দ্রবণে H+ আয়ন দান করে। আমরা প্রতিনিয়তই অনেক খাবার খাই যার মধ্যে জৈব এসিড বিদ্যমান। যেমন - অ্যাসিটিক এসিড, সাইট্রিক এসিড, অক্সালিক এসিড, ফরমিক এসিড।

এসিডের বৈশিষ্ট্য

১. জলীয় দ্রবণে হাইড্রোজেন আয়ন দেয় ।
২. ইহা ক্ষারের সাথে বিক্রিয়া করে লবণ ও পানি উৎপন্ন করে।
৩. এসিড টক স্বাদ যুক্ত ৷
৪. পানিতে দ্রবীভূত অবস্থায় নীল লিটমাসকে লাল করে ৷
৫. এসিড ধাতব কার্বনেটের সাথে বিক্রিয়া করে লবণ, পানি ও কার্বন–ডাই–অক্সাইড তৈরি করে।

এসিডের ব্যবহার

১. সিরকা বা ভিনেগারে এসিটিক এসিডের 4% – 10% জলীয় দ্রবণ ব্যবহার করা হয়, যা খাদ্য সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়। এসিটিক এসিডের প্রোটন ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে এবং এর ফলে খাবার অনেকদিন সতেজ থাকে।
২. কোমল পানীয়তে কার্বনিক এসিড থাকে যা কার্বন ডাই অক্সাইড ও পানির বিক্রিয়ায় তৈরি হয়। খাবার হজম করার জন্য কোমল পানীয় ব্যবহার করা হয়।
৩. ভিটামিন সি হচ্ছে এসকরবিক এসিড। যা আমাদের শারীরিক চাহিদার যোগান দেয় ।
৪. বিভিন্ন ধরনের আচার সংরক্ষণে ভিনেগার বা এসিটিক এসিড ব্যবহার করা হয়।
৫. টয়লেট পরিষ্কারে যে পরিষ্কারক ব্যবহার করা হয় তার মূল উপাদান শক্তিশালী এসিড। যেমন: হাইড্রোক্লোরিক এসিড , নাইট্রিক এসিড , সালফিউরিক এসিড ।
৬. অ্যামোনিয়া সার উৎপাদনে এসিড ব্যবহৃত হয়।
৭. সোনার গহনা তৈরির সময় স্বর্ণকাররা নাইট্রিক এসিড ব্যবহার করে ।
৮. বাসাবাড়িতে সাপের উপদ্রব কমানোর জন্য যে রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহৃত হয় তা মূলত কার্বোলিক এসিড ।
৯. আমরা বিভিন্ন কাজে যেমন - আইপিএস , গাড়ি , মাইক বাজানোর সময় , সেীর বিদ্যুৎ উৎপাদন ইত্যাদি ক্ষেত্রে যে ব্যাটারি ব্যবহার করি তাতে সালফিউরিক এসিড ব্যবহৃত হয় ।
১০. আমাদের খাদ্য দ্রব্য হজম করার জন্য পাকস্থলীতে হাইড্রোক্লোরিক এসিড অত্যাবশ্যকীয় ।

কোনো এসিডকে পাতলা করতে এসিডে পানি না পানিতে এসিড ঢালতে হয়: কোনো এসিডকে পাতলা করতে পানিতে এসিড ঢালতে হবে। কারণ এসিডে পানি ঢাললে এসিডের সংস্পর্শে এসে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়, যার ফলে কাঁচের পাত্র ফেটে যেতে পারে। কিন্তু পানিতে এসিড ঢাললে অল্প পরিমাণ এসিড পানির সংস্পর্শে এসে যে তাপের উদ্ভব ঘটায় তা পানির আধিক্যের কারণে তার মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। কাঁচের পাত্র ফেটে যাবার কোনো সম্ভাবনা থাকে না ।

কোন ফলে কোন এসিড উপাদান:

বিভিন্ন ফলে প্রাপ্ত এসিড
ফল প্রাপ্ত এসিড /উপাদান
পাকা কলা অ্যামাইল অ্যসিটেট
কমলালেবু এসকরবিক এসিড
টমেটো ম্যালিক এসিড
লেবু সাইট্রিক এসিড
আপেল ম্যালিক এসিড
তেঁতুল টারটারিক এসিড
আমলকি অক্সালিক এসিড
আঙ্গুর টারটারিক এসিড
চা ট্যানিক এসিড

এসিড বৃষ্টি: সালফার ও নাইট্রোজেন অক্সাইড সমূহ যখন বায়ুমন্ডলে সালফিউরিক এসিড নাইট্রিক এসিডে পরিণত হয়ে এক সময় বৃষ্টির সঙ্গে ভূ-পৃষ্ঠে নেমে আসে তখন তাকে এসিড বৃষ্টি বলে । এসিড বৃষ্টিতে থাকে: সালফিউরিক এসিড = 60 -70% , নাইট্রিক এসিড = 30 - 40%

শিল্প কলকারখানা সমৃদ্ধ এলাকায় এসিড বৃষ্টি বেশি হওয়ার কারণ: শিল্প-কলকারখানা এলাকায় বিশেষ করে টেক্সটাইল, ডায়িং কারখানায় ব্যবহৃত রাসায়নিক দ্রব্য থেকে(CO2, SO2, SO3, NO2) গ্যাসগুলো বেশি নির্গত হয়। এই গ্যাসগুলোর মধ্যে নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড বৃষ্টির পানির সাথে মিশে নাইট্রাস ও নাইট্রিক এসিড তৈরি করে। আবার সালফার জাতীয় গ্যাস গুলো পানির সাথে বিক্রিয়ায় সালফিউরিক এসিড উৎপন্ন করে। এইজন্য শিল্প-কলকারখানা এলাকায় এসিড বৃষ্টি বেশি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

সফট ড্রিংক - কার্বনিক অ্যাসিড। কার্বোনেটেড কোমল পানীয় হলো পানির সাথে CO2 এর মিশ্রণ। এরা একত্রে মিশে কার্বোনিক এসিড তৈরি করে। এই দুর্বল এসিড (pH 3 থেকে 4) এর সাথে বিভিন্ন ফ্লেভার, রং ও চিনি মিশিয়ে বেভারেজ পানীয় তৈরী করে ।

এসিড বিদ্যুৎ পরিবহন করার কারণ: এসিডকে পানিতে দ্রবীভূত করলে এর মধ্যে বিদ্যমান হাইড্রোজেন জলীয় দ্রবণে আয়নের পরিণত হয়। উৎপন্ন হাইড্রোজেন আয়ন জলীয় দ্রবণে ভ্রাম্যমাণ থাকে বলে বিদ্যুৎ জলীয় দ্রবণে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর হয়।

ক্ষারক ও ক্ষার

ক্ষারক : সাধারণত ধাতু বা ধাতুর মতো ক্রিয়াশীল যৌগমূলক অক্সাইড এবং হাইড্রোক্সাইড যা এসিডের সাথে বিক্রিয়া করে লবণ ও পানি উৎপন্ন করে তাকে ক্ষারক বলে । ক্ষারকের উদাহরণ হচ্ছে: সোডিয়াম অক্সাইড ( Na 2 O ), কপার অক্সাইড (CuO), ফেরাস অক্সাইড (FeO), সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড (NaOH), ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড Ca(OH) 2 , ফেরাস হাইড্রোক্সাইড Fe (OH) 2 , অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইড ( NH 4 OH ) ইত্যাদি। অ্যামোনিয়াম আয়ন ( NH 4 + ), ফসফোনিয়াম আয়ন ( PH 4 + ) এগুলো ধাতুর মতো ক্রিয়াশীল মূলক। কেননা ধাতব আয়ন, যেমন - Na + , K + , ইত্যাদি অধাতব আয়ন Cl - , SO 4 2- , ইত্যাদির সাথে যুক্ত হয়ে আয়নিক যৌগ NaCl, KCl, Na 2 SO 4 , K 2 SO 4 উৎপন্ন করে তেমনই NH 4 + , PH 4 + আয়ন Cl - , SO 4 2- ইত্যাদির সাথে যুক্ত হয়ে আয়নিক যৌগ NH 4 Cl , PH 4 Cl , (NH4) 2 SO 4 , (PH4) 2 SO 4 ইত্যাদি উৎপন্ন করে। এসিডের সাথে ক্ষারের বিক্রিয়ায় লবণ ও পানি উৎপন্ন হওয়ার বিক্রিয়াকে এসিড-ক্ষারক প্রশমন বিক্রিয়া বলে। তাই বলা হয় এসিড ক্ষারককে আর ক্ষারক এসিডকে প্রশমিত করে।
ক্ষার : ধাতু বা ধাতুর মতো ক্রিয়াশীল যৌগমূলকের হাইড্রোক্সোইড যৌগ যা পানিতে দ্রবণীয় তাদেরকে ক্ষার বলে। কোনো যৌগের ক্ষার হবার জন্য 2টি শর্ত রয়েছে: (i) যৌগটিতে হাইড্রোক্সাইড ( OH - ) যৌগমুলক থাকতে হবে এবং (ii) ঐ যৌগ পানিতে দ্রবীভূত হতে হবে। NaOH ক্ষার, কারণ সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড যৌগে OH মূলক আছে এবং এটি পানিতে দ্রবণীয়। Fe(OH)2 কে ক্ষার বলা যায় না। কারণ এটিতে OH গ্রুপ আছে কিন্তু এটি পানিতে দ্রবণীয় নয়, এটি শুধু ক্ষারক। CaO ক্ষারক, ক্ষার নয় কারণ CaO এ OH - মূলক নাই। অর্থাৎ হাইড্রোক্সাইড মূলকধারী পানিতে দ্রবণীয় ক্ষারকগুলোই হলো ক্ষার। তাই বলা যায় সব ক্ষারকই ক্ষার নয় কিন্তু সব ক্ষারই ক্ষারক।
বাসাবাড়িতে ক্ষার জাতীয় অনেক পদার্থ ব্যবহার করা হয়। যেমন: টয়লেট পরিষ্কার করার জন্য যে টয়লেট ক্লিনার ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড ক্ষার থাকে। কাচ পরিষ্কার করার জন্য যে গ্লাস ক্লিনার ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইড ক্ষার ( NH 4 OH ) থাকে।

দুর্বল ক্ষার : যে সকল ক্ষার জলীয় দ্রবণে আংশিক আয়নিত হয় তাকে দুর্বল ক্ষার বলে ।

ক্ষারকের বৈশিষ্ট্য

১. ক্ষারক জলীয় দ্রবণে OH + মূলক উৎপাদন করে ।
২. ইহা এসিডের সাথে বিক্রিয়া করে লবণ ও পানি উৎপন্ন করে।
৩. ইহার জলীয় দ্রবণ লাল লিটমাসকে নীল করে।
৪. ক্ষারকের দ্রবণ সাবান পানির ন্যায় পিচ্ছিল।
৫. বর্ণহীন ফেনফথ্যালিন গোলাপি বর্ণ ধারণ করে।

ক্ষারক ও ক্ষারের ব্যবহার

১. আমাদের বহুল ব্যবহৃত ব্লিচিং পাউডার তৈরি হয় শুকনো ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড ও ক্লোরিন গ্যাসের বিক্রিয়া ঘটিয়ে ।
২. পানি ও ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইডের তৈরি পেস্ট যা মিল্ক অব লাইম নামে পরিচিত যেটি পোকামাকড় দমনে ব্যবহৃত হয় ।
৩. টয়লেট ক্লিনারে সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড ব্যবহার করা হয়, যা একটি তীব্র ক্ষার। টয়লেট ক্লিনার পানির সাথে বিক্রিয়ায় অক্সিজেন উৎপন্ন করে যা জীবাণু ধ্বংস করে।
৪. গ্লাস ক্লিনারে অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইড ও আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহল ব্যবহৃত হয়। অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইড একটি দুর্বল ক্ষার যা অ্যামোনিয়ার জলীয় দ্রবণ ।

লবণ

লবণ: এসিডের অনুস্থিত প্রতিস্থাপনীয় হাইড্রোজেন পরমাণুকে ধাতু বা ধাতুর ন্যায় ক্রিয়াশীল মূলক দ্বারা আংশিক বা পূর্ণরূপে প্রতিস্থাপিত করিলে যে যৌগ উৎপন্ন তাহাকে লবণ বলে ।
যেমন: Na(OH)+HCI→ NaCI+ H 2 O
NaOH + H 2 SO 4 Na 2 SO 4 + H 2 O

লবণের শ্রেণিবিভাগ: লবণ প্রধানত তিন প্রকার—
১ । পূর্ণ লবণ
২ । এসিড লবণ বা আংশিক লবণ
৩ । ক্ষারকীয় লবণ

[ক] পূর্ণ লবণঃ এসিডের অনুস্থিত প্রতিস্থাপনীয় হাইড্রোজেনকে ধাতু বা ধাতুর ন্যায় ক্রিয়াশীল মূলক দ্বারা সম্পূর্ণরূপে প্রতিস্থাপিত করলে যে লবণ উৎপন্ন হয় তাহাকে পূর্ণ লবণ বলে। যেমন- NaCl, Na 2 SO 4 , AIPO 4 ইত্যাদি।

[খ] আংশিক লবণ বা এসিড লবণঃ এসিডের অণুতে প্রতিস্থাপনীয় হাইড্রোজেনকে আংশিক প্রতিস্থাপিত করলে যে লবণ উৎপন্ন হয় উহাকে আংশিক বা এসিড লবণ বলে। যেমন- NaHCO 3 , KHSO 4 , NaHSO 4 , KHCO 3 ইত্যাদি।

[গ] ক্ষারকীয় লবণঃ পূৰ্ণ লবণ প্ৰস্তুত করিতে যে পরিমাণ ক্ষারকের প্রয়োজন হয়, কোন এসিড তাহা অপেক্ষা বেশি পরিমাণ ক্ষারকের সাথে বিক্রিয়া করে যে লবণ উৎপন্ন করে উহাকে ক্ষারকীয় লবণ বলে । এগুলো ছাড়া আরও তিন প্রকার বিশেষ লবণ আছে। যেমন — ক) দ্বি লবণ বা যুগ লবণ, খ) জটিল লবণ, গ) মিশ্র লবণ ।

pH এর ধারণা

কোনো জলীয় দ্রবণের প্রকৃতি অম্লীয় নাকি ক্ষারীয় নাকি নিরপেক্ষ প্রকৃতির ইত্যাদি জানার জন্য pH একক ব্যবহার করা হয়। কোনো দ্রবণের pH হলো ঐ দ্রবণে উপস্থিত হাইড্রোজেন আয়নের ( H + ) ঘনমাত্রার ঋণাত্মক লগারিদম।
pH = -log[ H + ]
(pH লেখার সময় p ছোট হাতের আর H বড় হাতের লেখা হয়)
পানির pH = 7 (সাত) অর্থাৎ পানি নিরপেক্ষ ধর্মী। এর মান কমলে এসিড ধর্মী এবং বাড়লে তাকে ক্ষারধর্মী বলে। pH কোনো দ্রবণে হাইড্রোজেন আয়নের ঘনত্বের ঋণাত্বক লগারিদমকে নির্দেশ করে। যেমন— মানুষের রক্তে pH 7.35 থেকে 7.4 এর মধ্যে।
pH স্কেলের রেঞ্জ: ০-১৪।
কোন দ্রবণের pH = 7 হলে, দ্রবণটির প্রকৃতি: নিরপেক্ষ বা প্রশমিত দ্রবণ ।
কোন দ্রবণের pH < 7 হলে, দ্রবণটির প্রকৃতি: অম্লীয় দ্রবণ ।
কোন দ্রবণের pH > 7 হলে, দ্রবণটির প্রকৃতি: ক্ষারীয় দ্রবণ ।

রক্ত, মুখের লালা, চোখের পানি, প্রস্রাব, মাতৃদুগ্ধের স্বাভাবিক pH:
নির্দেশক pH
রক্ত 7.35~7.45
মুখের লালা 6.35~6.68
চোখের পানি 4.8০~7.50
প্রস্রাব 4.80~7.50
মাতৃদুগ্ধ 6.60 ~ 6.90

শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের PH:
অঙ্গের নাম PH
পাকস্থলী 1
মানুষের ত্বক 4.8 - 5.5
মূত্র 6
রক্ত 7.43-7.45
অগ্ন্যাশয় রস 8.1

বাফার দ্রবণ

যে দ্রবণ নিজস্ব pH স্থির রাখার ক্ষমতা রাখে, তাকে বাফার দ্রবণ বলে ।

বাফার- এর কাজ :
১. pH পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করা ।
২. দেহে এসিড বেস নিয়ন্ত্রণ করা।
আমাদের শরীরে বাফার হলো: বাই কার্বনেট বাফার ( NaHCO 3 ), অ্যামেনিয়াম বাফার।

বাফার দ্রবণ যেভাবে প্রস্তুত করা হয়: বাফার দ্রবণ হল ক) মৃদু এসিড ও তীব্র ক্ষার সহযোগে ঐ এসিডের কোন লবন যথাঃ CH 3 COOH CH 3 COONa দ্রবণের মিশ্রণ অথবা খ) মৃদু ক্ষারক ও তীব্র এসিড সহযোগে ঐ ক্ষারকের কোন লবন যেমনঃ NH 4 OH NH 4 Cl দ্রবণের মিশ্রণ ।

pH = P K + log [Salt] [Acid] - সমীকরণটির নাম কি: হেণ্ডারসন হেসেলবাখ সমীকরণ ।

যে সমীকরণের সাহায্যে বাফারের pH এর মান গণনা করা হয়: হেন্ডারসন সমীকরণের দ্বারা ।

পিএইচ ডায়াগ্রামের সাহায্যে কোনো তাপীয় সাইকেলের এনথালপি ও চাপ জানা যায় ৷

নির্দেশক

নির্দেশক: যে সব যৌগ নিজেদের বর্ণ পরিবর্তনের কোন দ্রবণ অম্লীয় বা ক্ষারীয় তা নির্দেশ করে, তাদের নির্দেশক বলে ।

বিভিন্ন মাধ্যমে নির্দেশকগুলোর বর্ণ পরিবর্তন:
নির্দেশক অম্লীয় মাধ্যমে বর্ণ ক্ষারীয় মাধ্যমে বর্ণ
লিটমাস লাল নীল
মিথাইল রেড লাল হলুদ
মিথাইল অরেঞ্জ লাল হলুদ
ফেনল রেড হলুদ লাল
ক্রিসল রেড হলুদ লাল
ব্রোমোফেনল হলুদ নীল
ফেনলফথ্যালিন বর্ণহীন লালচে বেগুনি

বিভিন্ন পদার্থ বিদ্যমান উপাদান:
চা কফি - ক্যাফেইন থাকে
কঁচুতে - ক্যালসিয়াম অক্সালেট থাকে
তামাকে - নিকোটিন থাকে
পপি /আফিম - মরফিন থাকে
মরিচে - ক্যাপসিন থাকে
সিনকোনা - স্টিয়ারিক এসিড থাকে

প্রশমন এনথালপি

আমরা জানি, এসিড জলীয় দ্রবণে H+ দান করে এবং ক্ষার জলীয় দ্রবণে OH দান করে। তাই এসিড ও ক্ষার একত্রে মিশ্রিত করলে এসিডের H+ আয়ন এবং ক্ষারের OH- আয়ন বিক্রিয়া করে পানি উৎপন্ন করে। যেমন— HCl পানিতে H+ আয়ন এবং NaOH পানিতে OH- দান করে। এ দ্রবণ দুইটিকে এক সাথে মিশ্রিত করলে এসিডের H+ এবং ক্ষারের OH— বিক্রিয়া করে পানি উৎপন্ন করে।

এসিডের বাকি ঋণাত্মক আয়ন Cl এবং ক্ষারের ধনাত্মক আয়ন বিক্রিয়া করে লবণ (NaCl) উৎপন্ন করে। এসিড ক্ষারের সাথে বিক্রিয়া করে লবণ ও পানি উৎপন্ন হওয়ার বিক্রিয়াকে প্রশমন বিক্রিয়া বলে। কেননা এ বিক্রিয়াতে এসিড তার এসিডত্ব হারায় আর ক্ষার তার ক্ষারকত্ব হারায় এবং প্রশম পদার্থ লবণ আর পানি উৎপন্ন করে।

HCl(aq) + NaOH (aq) ; ( এসিড + ক্ষার ) → NaCl (aq) + H2O (I) ( লবণ + পানি )

উপরের বিক্রিয়াতে দেখো এক মোল হাইড্রোক্লোরিক এসিড এক মোল সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইডকে সম্পূর্ণরূপে প্রশমিত করে। কাজেই দুই মোল হাইড্রোক্লোরিক এসিড দুই মোল সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইডকে সম্পূর্ণরূপে প্রশমিত করবে। আবার, সালফিউরিক এসিড ও সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইডের বিক্রিয়ায় সোডিয়াম সালফেট লবণ আর পানি উৎপন্ন করে।

H2SO4 (aq) + 2NaOH(aq) ; ( এসিড + ক্ষার ) → Na2SO4 (aq) + H2O (1) ( লবণ + পানি )

উপরের বিক্রিয়াতে দেখো এক মোল হাইড্রোক্লোরিক এসিড এক মোল সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইডকে সম্পূর্ণরূপে প্রশমিত করে। কাজেই দুই মোল হাইড্রোক্লোরিক এসিড দুই মোল সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইডকে সম্পূর্ণরূপে প্রশমিত করবে। আবার, সালফিউরিক এসিড ও সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইডের বিক্রিয়ায় সোডিয়াম সালফেট লবণ আর পানি উৎপন্ন করে।

H2SO4 (aq) + 2NaOH(aq) ; ( এসিড + ক্ষার ) → Na2SO4 (aq) + H2O ( লবণ + পানি )

উপরের বিক্রিয়া হতে দেখা যায়, এক মোল সালফিউরিক এসিড দুই মোল সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইডকে সম্পূর্ণরূপে প্রশমিত করে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, কোনো নির্দিষ্ট এসিডের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অপর কোনো নির্দিষ্ট ক্ষারের নির্দিষ্ট পরিমাণকে সম্পূর্ণরূপে প্রশমিত করবে।

Ba(OH)2 (aq) + 2HCl (aq) → BaCl2 (aq) + 2H2O [L]

বিক্রিয়াটিতে ২ মোল পানি উৎপন্ন হয়েছে। বিক্রিয়াটির প্রশমন এনথালপি - 57.0 KJ/mole । তাই বিক্রিয়াটির এনথালপির পরিবর্তন – ∆H = 57.0 × 2 KJ = -114 KJ.

Internal Energy এবং Pressure - Volume এর গুণফল (PV) যোগ করলে হয় Enthalpy/এনথালপি ।

দৈনন্দিন জীবনে প্রশমন বিক্রিয়ার গুরুত্ব

পরিপাক: খাদ্য হজম করতে পাকস্থলীতে হাইড্রাক্লোরিক এসিড নিঃসৃত হয়। কোনো কারণে পাকস্থলীতে এই এসিডের পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে তখন পেটে অস্বস্তি বোধ হয়। সাধারণভাবে এটিকে এসিডিটি বলে। বেশিদিন এসিডিটি থাকলে পাকস্থলীতে ঘা হয়ে যেতে পারে। তাই এই এসিডকে প্রশমিত করতে এন্টাসিড নামক ওষুধ খেতে হয়। এন্টাসিডে Al(OH)3 ও Mg(OH)2 থাকে। এরা ক্ষারজাতীয় পদার্থ। তাই পেটের অতিরিক্ত হাইড্রোক্লোরিক এসিডকে এরা প্রশমিত করে।

Al(OH)3 + 3HCl → AlCl3 + 3H2O
Mg(OH)2 + 2HCl → MgCl2 + 2H2O

দাঁতের যত্নে: কখনো মিষ্টিজাতীয় খাবার খেয়ে মুখ পরিষ্কার না করলে কিছুক্ষণ পর মুখে টক টক অনুভূত হয়। আসলে মুখের মধ্যে অনেক ব্যাকটেরিয়া থাকে যা আমাদের খাওয়া খাবার থেকে বিভিন্ন ধরনের জৈব এসিড তৈরি করে। তাই মুখে টক স্বাদ অনুভূত হয়। এই এসিড দাঁতের এনামেলকে (ক্যালসিয়ামের যৌগ) ক্ষয় করে। টুথপেস্টে থাকা ক্ষারজাতীয় পদার্থ এ সকল এসিডকে প্রশমিত করে। ফলে দাঁতের এনামেল রক্ষা পায়।

কৃষিক্ষেত্রে: গাছ যখন মাটি থেকে বিভিন্ন ধাতব আয়ন যেমন— Fe2+, Mg2+, Ca2+, K+ ইত্যাদি শোষণ করে তখন মাটি অম্লীয় হয়ে যায়। মাটির উর্বরতা হ্রাস পায়। মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করতে চুন ব্যবহার করতে হয়। চুনের রাসায়নিক নাম ক্যালসিয়াম অক্সাইড (CaO)। চুন মাটির অতিরিক্ত এসিডকে প্রশমিত করে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে।

নবীনতর পূর্বতন