দর্পণ ও লেন্স

দর্পণ ও লেন্স

দর্পণ: যে মসৃণ তলে আলোর নিয়মিত প্রতিফলন ঘটে তাকে দর্পণ বলে।

দর্পণের প্রকারভেদ: দর্পণ প্রধানত দুই প্রকার ।
যথা- ক) সমতল দর্পণ
খ) গোলীয় দৰ্পণ
গোলীয় দর্পণ আবার দুইপ্রকার ।
যথা- i) উত্তল দর্পণ
ii) অবতল দর্পণ

পারা লাগান বা “সিলভারিং”: সাধারণত কাঁচের একদিকে ধাতুর প্রলেপ লাগিয়ে দর্পণ তৈরি করা হয়। কাঁচের উপর ধাতুর প্রলেপ দেওয়াকে পারা লাগান বা “সিলভারিং” করা বলে। আয়নার পিছনে সাধারণত রূপা বা পারদ (মার্কারি) এর প্রলেপ দেওয়া হয়।

ভাল সমতল দর্পণের বৈশিষ্ট্য:
১. দর্পণের পৃষ্ঠ সমতল হতে হবে।
২. দর্পণের পুরুত্ব কম এবং সুষম হতে হবে।
৩. দর্পণের পিছনে ধাতব প্রলেপ ভাল হতে হবে। প্রলেপ যত ভাল হবে বিম্ব তত উজ্জ্বল হয়।
৪. দর্পণের কাচ বায়ু বুদবুদ শূন্য হবে ।

বিম্ব : কোন বিন্দু থেকে নিঃসৃত আলোক রশ্মিগুচ্ছ প্রতিফলিত বা প্রতিসরিত হয়ে যদি দ্বিতীয় কোন বিন্দুতে মিলিত হয় বা দ্বিতীয় কোন বিন্দু থেকে অপসৃত হচ্ছে বলে মনে হয়, তাহলে ঐ দ্বিতীয় বিন্দুকে প্রথম বিন্দুর বিম্ব বলে ।
বিম্বের প্রকারভেদ: বিম্ব দুই রকমের হয়। যথা- i) সদ বিম্ব ii) অসদ বিম্ব

সদ বিম্বের বৈশিষ্ট্য: ১. প্রতিফলিত বা প্রতিসরিত আলোক রশ্মির প্রকৃত মিলনের ফলে সদ বিম্ব গঠিত হয়।
২. চোখে দেখা যায় এবং পর্দায়ও ফেলা যায়।
৩. অবতল দর্পণ ও উত্তল লেন্সে উৎপন্ন হয় ।

অসদ বিম্বের বৈশিষ্ট্য:
১. অসদ বিম্বের ক্ষেত্রে প্রতিফলিত বা প্রতিসরিত রশ্মিগুলোর প্রকৃত মিলন হয় না ।
২. চোখে দেখা যায় কিন্তু পর্দায় ফেলা যায় না।
৩. সব রকম দর্পণ ও লেন্সে উৎপন্ন হয়।

সমতল দর্পণে সৃষ্ট বিম্বের বৈশিষ্ট্য:
১. দর্পণ থেকে বস্তুর দূরত্ব যত, দর্পণ থেকে বিম্বের দূরত্বও তত।
২. বস্তু ও বিম্ব যে সরলরেখায় অবস্থিত, সেটি দর্পণকে লম্বভাবে ছেদ করে ।
৩. বিম্ব অসদ ও সোজা ।
৪. বিম্বের পার্শ্ব পরিবর্তন ঘটে।
৫. বিম্বের আকার বস্তুর আকারের সমান ।

বিম্বের পার্শ্ব পরিবর্তন: সমতল দর্পণের সামনে দাঁড়ালে আমাদের ডান হাতকে বাম হাত এবং বাম হাতকে ডান হাত বলে মনে হয়। মনে হয় যেন সমগ্র দেহের পার্শ্ব পরিবর্তন হয়েছে। একে বিম্বের পার্শ্ব পরিবর্তন বলে ।

আয়নায় প্রতিফলিত হলে কোন শব্দগুলোর পরিবর্তন হবে না:
শব্দ বা বস্তুটি প্রতিসম হলে, সমতল দর্পণে সৃষ্ট বিম্বের পার্শ্ব পরিবর্তন বুঝা যায় না।
যেমনঃ O, T প্রভৃতি প্রতিসম বর্ণের সৃষ্ট বিম্বের পার্শ্ব পরিবর্তন বুঝা যায় না।

দর্পণের পৃষ্ঠ স্পর্শ না করে কিভাবে দর্পণ সনাক্ত করা যায়:
কোন দর্পণের একেবারে নিকটে একটি আঙুল খাড়াভাবে স্থাপন করলে যদি
১. বিম্বটি সোজা এবং লক্ষবস্তুর চেয়ে বড়ঃ দর্পণটি অবতল;
২. বিম্বটি সোজা এবং লক্ষবস্তুর চেয়ে ছোটঃ দর্পণটি উত্তল;
৩. বিম্বটি সোজা এবং লক্ষবস্তুর সমানঃ দর্পণটি সমতল ।

সমতল দর্পণে দর্শক তার নিজের পূর্ণ বিম্ব দেখতে চাইলে দর্পণের দৈর্ঘ্য কত হওয়া প্রয়োজন: পূর্ণ বিম্ব দেখতে সমতল দর্পণের দৈর্ঘ্য কমপক্ষে দর্শকের উচ্চতার অর্ধেক হতে হবে।

দর্পণের ব্যবহার:
সমতল দর্পণঃ
১. দর্শকের চেহারা দেখার জন্য ব্যবহৃত হয়।
২. সরল পেরিস্কোপ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
অবতল দর্পণঃ
১. মুখমণ্ডলের বিবর্ধিত বিম্ব তৈরি করা যায় বলে, রূপ চর্চা ও দাড়ি কাটার সময় ব্যবহৃত হয়।
২. স্টীমারের সার্চ লাইটের প্রতিফলক হিসেবে ব্যবহৃত হয় ।
৩. ডাক্তাররা চোখ, নাক, কান ও গলা পর্যবেক্ষণ করার সময় এই দর্পণ ব্যবহার করেন ।
৪. নভো দূরবীক্ষণে অবতল দর্পণের ব্যবহার দেখা যায় ।
৫. উত্তাপক ও বিবর্ধক হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
উত্তল দর্পণঃ
১. পিছনের যানবাহন বা পথচারী দেখার জন্য বিভিন্ন গাড়িতে এই দর্পণ ব্যবহৃত হয়।
২. মোটর গাড়ির হেডলাইট বা রাস্তার লাইটে প্রতিফলক হিসেবে দর্পণ ব্যবহৃত হয়।

লেন্স বা পরকলা : দুটি গোলীয় পৃষ্ঠ দ্বারা সীমাবদ্ধ কোন স্বচ্ছ প্রতিসারক মাধ্যমকে লেন্স বলে ।
লেন্সের প্রকারভেদ: লেন্স প্রধানত দু রকমের। যথাঃ
১. স্থূলমধ্য বা উত্তল বা অভিসারী লেন্স এবং
২. ক্ষীণমধ্য বা অবতল বা অপসারী লেন্স ।

লেন্সের পৃষ্ঠ স্পর্শ না করে কিভাবে লেন্স সনাক্ত করা যায়:
লেন্সের সামনে খুব কাছাকাছি একটি আঙুল রেখে অপর দিক থেকে দেখলে যদি আঙুলের
১. বিম্বটি সোজা এবং লক্ষবস্তুর চেয়ে বড়: লেন্সটি উত্তল;
২. বিম্বটি সোজা এবং লক্ষবস্তুর চেয়ে ছোট: লেন্সটি অবতল।

লেন্সের প্রতিবিম্বের প্রকৃতিঃ
অবতল দর্পন ও উত্তল লেন্স : বাস্তব ও উল্টা (এরা অবাস্তব ও সিধা প্রতিবিম্ব ও সৃষ্টি করে)
উত্তল দর্পণ ও অবতল লেন্স : সর্বদা অবাস্তব ও সোজা

লেন্সের ক্ষমতা :
লেন্সের ক্ষমতার প্রচলিত একক ডাইঅপ্টার ।
উত্তল লেন্সের ক্ষমতা ধনাত্মক।
অবতল লেন্সের ক্ষমতা ঋণাত্মক ৷
কোনো লেন্সের ক্ষমতা +1D বলতে বোঝায়: লেন্সটি উত্তল এবং এটি প্রধান অক্ষের ১ মিটার দূরে আলোক রশ্মিগুচ্ছকে মিলিত করবে।
কোনো লেন্সের সক্ষমতা 2D বলতে বোঝায়: লেন্সটি অবতল এবং এটি প্রধান অক্ষের সমান্তরাল একগুচ্ছ আলোক রশ্মিকে এমনভাবে অপসারিত করে যে এগুলো কোন লেন্স থেকে ৫০ সেন্টিমিটার দূরের কোন বিন্দু থেকে অপসৃত হচ্ছে বলে মনে হয়।
লেন্সের ক্ষমতা তার ফোকাস দূরত্বের ব্যস্তানুপাতিক। সুতরাং যে লেন্সের ফোকাস দূরত্ব যত কম, তার ক্ষমতা তত বেশি।

লেন্সের ব্যবহার:
উত্তল লেন্সঃ
১. আতশী কাঁচ হিসাবে ব্যবহার করা হয়।
২. আগুন জ্বালানোর কাজে ব্যবহৃত হয়।
৩. চশমা, ক্যামেরা, বিবর্ধক কাঁচ, অণুবীক্ষণ যন্ত্র ইত্যাদি আলোক যন্ত্রে ব্যবহৃত হয়।
অবতল লেন্সঃ
১. প্রধানত চশমায় ব্যবহার করা হয়।
২. গ্যালিলিওর দূরবীক্ষণ যন্ত্রেও অবতল লেন্স ব্যবহার করা হয়।
৩. সিনেমাস্কোপ প্রজেক্টারে ব্যবহৃত হয়।

তথ্যকণিকা:
মানব চোখের লেন্স উভউত্তল / দ্বিউত্তল ।
গোলীয় দর্পণের উন্মেষ ৬০-১০০ হলে, তাকে ক্ষুদ্র উন্মেষের দর্পণ বলে ।
বিষম দৃষ্টিসম্পন্ন লোকদের টরিক লেন্স ব্যবহার করতে হয়।
উত্তল লেন্সে 2f দুরে বস্তু থাকলে বিম্ব অবস্থান করবে লেন্সের পশ্চাতে 2f দুরে।
চোখের ত্রুটি: স্বাভাবিক চোখের দৃষ্টির পাল্লা ২৫ সেন্টিমিটার থেকে অসীম পর্যন্ত । যদি কোন চোখ এই পাল্লার মধ্যে কোন বস্তুকে স্পষ্ট দেখতে না পায়, তাহলে সেই চোখে ত্রুটি আছে বলে ধারণা করা হয় ।
Contact lenses হলো দৃষ্টিশক্তি বাড়ানোর জন্য অক্ষিগোলকের উপর স্থাপিত প্লাস্টিক নির্মিত লেন্স। সুতরাং Contact lenses চোখে পড়া হয় ।

নবীনতর পূর্বতন